দেশের অন্তত ১৬ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সময়ে চট্টগ্রামে মৌসুমের রেকর্ড বৃষ্টিপাত, কক্সবাজারে পাহাড়ধসে একের পর এক প্রাণহানি, বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হওয়া, সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়া-সব মিলিয়ে বর্ষার শুরুতেই বাংলাদেশ একটি বহুমাত্রিক দুর্যোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে অতিবৃষ্টি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি নতুন বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রের প্রস্তুতিও হতে হবে আরো দূরদর্শী, সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে আটজনের মৃত্যু শুধু হৃদয়বিদারক নয়, এটি আমাদের দীর্ঘদিনের অবহেলারও নির্মম প্রতিচ্ছবি। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসতি, নাজুক আশ্রয়কেন্দ্র এবং টানা বর্ষণের মধ্যে সীমিত নিরাপত্তাব্যবস্থা-এই বাস্তবতা বহু বছর ধরেই পরিচিত। তবু প্রতি বর্ষায় একই ধরনের মৃত্যুর খবর আমাদের শুনতে হয়। অন্যদিকে জেলার ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে, বহু মানুষ পানিবন্দী, সেতু ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সেন্ট মার্টিনের সঙ্গে নৌযোগাযোগ বন্ধ থাকায় খাদ্যসংকটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এটি শুধু একটি জেলার সংকট নয়; এটি দুর্যোগ প্রস্তুতির সামগ্রিক সক্ষমতার প্রশ্ন।
চট্টগ্রামের পরিস্থিতিও সমান উদ্বেগজনক। এক দিনে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিতে নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। সড়ক ভেঙেছে, গাছ উপড়ে পড়েছে, রেললাইনের ওপর পানি উঠে যাওয়ায় প্রায় এক হাজার যাত্রীবাহী ট্রেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। নগর উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং অবকাঠামো পরিকল্পনায় দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা এমন দুর্যোগে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা দুর্যোগের অভিঘাতও সহ্য করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবার বিপদের পূর্বাভাস আগেই এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে ১৬ জেলায় বন্যার শঙ্কার কথা জানিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরও আরো কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। অর্থাৎ এবার রাষ্ট্রের সামনে প্রস্তুতির সময় আছে। এই সময়কে অবহেলা করা মানে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির দায়ও এড়িয়ে যাওয়া। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন হওয়া উচিত-উদ্ধারের চেয়ে প্রতিরোধ অধিক কার্যকর, আর প্রতিরোধের প্রথম শর্তই হলো আগাম সতর্কতা।
এখন প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতি ও নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল থেকে মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে প্রয়োজনীয় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবায় প্রস্তুত রাখা, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক, সশস্ত্র বাহিনী এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে খাল-নালা ও জলপ্রবাহের পথ সচল রাখা, নগরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা কার্যকর করা এবং বন্যা ও পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকাগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। দুর্যোগ মোকাবিলা কেবল বর্ষাকালের দায়িত্ব নয়; এটি সারা বছরের পরিকল্পনার বিষয়।
বাংলাদেশ বহু দুর্যোগ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। সেই অভিজ্ঞতা আজ আরো কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সময় এসেছে। প্রতিটি প্রাণ অমূল্য, প্রতিটি ক্ষতি রাষ্ট্রের ক্ষতি। তাই বন্যা, পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতাকে কেবল মৌসুমি দুর্ভোগ হিসেবে দেখার সুযোগ আর নেই। পূর্বাভাস যখন সামনে, তখন দায়িত্বও স্পষ্ট। আগাম সতর্কতা, সমন্বিত প্রস্তুতি এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই আমরা দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারি। প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, প্রকৃতির সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে সময়োপযোগী প্রস্তুতিই আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
সানা/আপ্র/৮/৭/২০২৬