জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐক্যের ডাক, বাস্তবায়নের এখনই সময়। বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল ক্ষমতার ভাষা নয়, দায়িত্বের ভাষা; প্রতিশোধের আহ্বান নয়, জাতীয় ঐক্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের অঙ্গীকার। একটি বিভাজিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বার্তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন উচ্চারণের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে তার বাস্তব প্রতিফলনে-নীতিতে, প্রশাসনে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জাতিকে বিভক্ত রেখে কোনো দেশের টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেছেন, বিচার করতে গিয়ে যেন অন্যায় না হয়; প্রকৃত অপরাধীর বিচার অবশ্যই হবে, কিন্তু নিরপরাধ কেউ যেন অবিচারের শিকার না হন। এই বক্তব্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ আইনের শাসনের মূল দর্শনই হলো-ন্যায়বিচার হবে নিরপেক্ষ, প্রতিহিংসামুক্ত এবং প্রমাণনির্ভর।
বক্তৃতার সবচেয়ে আবেগঘন অংশ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ। তিনি বলেন, যদি তিনি তাঁর মা কিংবা প্রয়াত ভাইকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন যে তাঁদের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়া উচিত কি না, তবে তাঁর বিশ্বাস, তাঁদের উত্তর হতো-প্রতিশোধ নয়; দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে নেওয়াই হবে প্রকৃত দায়িত্ব। ব্যক্তিগত বেদনার এমন রাজনৈতিক রূপান্তর তখনই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন তা রাষ্ট্রীয় আচরণের নীতিতে পরিণত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিশোধের রাজনীতি সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কখনো স্থিতিশীল রাষ্ট্র, কার্যকর গণতন্ত্র কিংবা টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে না।
এই প্রেক্ষাপটে সমবায়ভিত্তিক উন্নয়ন নিয়ে সরকারের বক্তব্যও বিশেষভাবে তাৎপর্য বহন করে। মানুষের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সহযোগিতা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি-এসবই জাতীয় ঐক্যের বাস্তব রূপ। উন্নয়ন কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়; এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিক আস্থা, সামাজিক ন্যায় এবং অর্থনৈতিক সুযোগের সমবণ্টন নিশ্চিত হয়। দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক সমবায় কাঠামো সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
তবে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা অন্যত্র। রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর বিদ্বেষ, ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা, মববাজি কিংবা গণপিটুনির সংস্কৃতি-এসব কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সহায়ক নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গণতন্ত্রের অপরিহার্য ভিত্তি, তেমনি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে নির্মূল করার সংস্কৃতিও সমানভাবে গণতন্ত্রবিরোধী। রাষ্ট্রকে এ দুই চরমতার বাইরে থেকে আইনের শাসন, সাংবিধানিকতা এবং নাগরিক অধিকারের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা কেবল স্মরণসভা বা আনুষ্ঠানিক সম্মাননায় নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান আইনি সুরক্ষা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং উন্নয়নের ন্যায্য অংশীদারিত্ব লাভ করবেন। জাতীয় ঐক্যের আহ্বান যদি সত্যিই রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হয়, তবে তার প্রথম শর্ত হবে প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়, বিভাজনের পরিবর্তে সংলাপ এবং ক্ষমতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের শক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন আবেগনির্ভর রাজনৈতিক স্লোগান নয়; প্রয়োজন নীতিনিষ্ঠ রাষ্ট্রচিন্তা। প্রধানমন্ত্রীর ঐক্যের আহ্বান সেই সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এখন সময় প্রমাণ করার-ঐক্য কেবল বক্তৃতার অলংকার নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর দর্শন।
সানা/আপ্র/৬/৭/২০২৬