গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬

মেনু

বিলম্বিত নিন্দা, কূটনীতির কঠিন প্রশ্ন

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:৪৭ পিএম, ০৫ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০২:৩৮ এএম ২০২৬
বিলম্বিত নিন্দা, কূটনীতির কঠিন প্রশ্ন
ছবি

ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের প্রতিটি শব্দের যেমন গুরুত্ব আছে, তেমনি আছে প্রতিটি নীরবতারও। কখনো একটি বিবৃতি কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে, আবার কখনো বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া অনাকাঙিক্ষত প্রশ্নের জন্ম দেয়। কারণ কূটনীতির অভিধানে সময় কেবল একটি পরিমাপ নয়; এটি বিশ্বাসযোগ্যতারও মানদণ্ড। সেই কারণেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস পর বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক নিন্দা স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

বাংলাদেশের স্পিকার তেহরানে ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন, শোক ও সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং একই সঙ্গে সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বিচারে এ অবস্থান ইতিবাচক। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান মূল্যায়িত হয় শুধু কী বলা হয়েছে, তার ওপর নয়; বরং কখন বলা হয়েছে, তার ওপরও। যে বক্তব্য যথাসময়ে উচ্চারিত হলে নীতিগত দৃঢ়তার প্রতীক হতে পারতো, দীর্ঘ বিলম্বের পর তা উচ্চারিত হলে স্বাভাবিকভাবেই তার কার্যকারিতা ও তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন বহুদিন ধরেই সুস্পষ্ট। স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌম সমতা এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির নীতিকে ধারণ করে এসেছে। এ কারণেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠ অনেক সময় তার সামর্থ্যের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ নৈতিক অবস্থান এমন এক শক্তি, যার কোনো সামরিক পরিমাপ নেই, কিন্তু যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সেই নৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় শর্ত হলো ধারাবাহিকতা। একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বা ভিন্ন মাত্রায় প্রতিক্রিয়া জানানো অনিবার্যভাবেই নীতির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বিশ্বরাজনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও শক্তির রাজনীতির সংঘাত ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা, সীমান্ত অতিক্রম করে সামরিক অভিযান, সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা, কিন্তু সেই ভারসাম্য যেন কখনো নীতিগত অস্পষ্টতায় পরিণত না হয়। নিরপেক্ষতা কখনোই নীরবতার সমার্থক নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থানই প্রকৃত নিরপেক্ষতার পরিচয়।

কূটনীতি কখনো কেবল সম্পর্ক রক্ষার কৌশল নয়; এটি মূল্যবোধ রক্ষারও শিল্প। বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ন্যায়, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে অটুট রাখা। বাংলাদেশ ও ইরানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেই সম্পর্ককে আরো গভীর করতে হলে কেবল আনুষ্ঠানিক সফর বা শোকবার্তাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অর্থনীতি, জ্বালানি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগে আরো কার্যকর অংশীদারত্ব। কিন্তু এসব উদ্যোগের ভিত্তিও শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বাসযোগ্য কূটনৈতিক আচরণের ওপর।

এই ঘটনাপ্রবাহ তাই একটি বৃহত্তর শিক্ষা সামনে আনে। পররাষ্ট্রনীতি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বিষয় নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি চরিত্রের প্রকাশ। সেখানে বক্তব্যের ভাষা যেমন সংযত হতে হবে, তেমনি হতে হবে সময়োপযোগী, স্পষ্ট এবং নীতিগতভাবে অবিচল। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠে তার ধারাবাহিক আচরণের মাধ্যমে, আর দুর্বল হয় তার দ্ব্যর্থতা ও বিলম্বে।

বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পরিসরে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের একটি রাষ্ট্র। এই অবস্থান আরো সুদৃঢ় করতে হলে পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি পদক্ষেপে নীতির দৃঢ়তা, সময়ের সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা প্রতিফলিত হওয়া অপরিহার্য। কূটনীতি কেবল রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার শিল্প নয়, রাষ্ট্রের চরিত্র প্রকাশেরও আয়না। সেই আয়নায় বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি যেন সব সময় স্পষ্ট, সাহসী ও নীতিনিষ্ঠ থাকে। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত শক্তির অহংকারকে নয়, ন্যায়ের পক্ষে সময়মতো উচ্চারিত কণ্ঠস্বরকেই দীর্ঘদিন মনে রাখে।
সানা/আপ্র/৫/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

সরকারের ছয় মাসের হিসাব, জনগণের প্রত্যাশার কঠিন আয়না
১৯ আগস্ট ২০২৬

সরকারের ছয় মাসের হিসাব, জনগণের প্রত্যাশার কঠিন আয়না

একটি নির্বাচিত সরকারের প্রথম ছয় মাস চূড়ান্ত সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি নয়; তবে রাষ্ট্র পরিচালনার গতিপথ...

অস্ট্রেলিয়া জয় শুধু জয় নয়, নতুন বাংলাদেশের বার্তা
১৮ আগস্ট ২০২৬

অস্ট্রেলিয়া জয় শুধু জয় নয়, নতুন বাংলাদেশের বার্তা

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারানো-শুধু একটি টেস্ট জয় নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের আত...

চিকিৎসা ও শিক্ষককল্যাণে রাষ্ট্রের মানবিক অঙ্গীকার
১৭ আগস্ট ২০২৬

চিকিৎসা ও শিক্ষককল্যাণে রাষ্ট্রের মানবিক অঙ্গীকার

রাষ্ট্রের সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু উন্নত অবকাঠামো নির্মাণে নয়; মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, সহজ, মর...

জঙ্গিবাদের বদলে যাওয়া ছকে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত
১৬ আগস্ট ২০২৬

জঙ্গিবাদের বদলে যাওয়া ছকে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত

বাংলাদেশকে ব্যবহার করে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা সন্ত্রাসী সেল ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বিএনপি সরকারের ছয় মাস: প্রত্যাশা কতটা, প্রাপ্তি কতখানি

আজ ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। এর আগে ছয় মাসের কাজের মূল্যায়নে সরকার যেমন বেশ কিছু অর্জনের কথা বলছে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকদের প্রশ্নও সামনে এসেছে। সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেছেন, ছয় মাসের লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সব কর্মসূচিই পূরণ হয়েছে-কোথাও ৯০, কোথাও ৯৫ এবং কোথাও শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রিয় পাঠক, সরকার ভালো করছে নাকি মন্দ করছে? হ্যাঁ বা না জানান।

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে