একটি নির্বাচিত সরকারের প্রথম ছয় মাস চূড়ান্ত সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি নয়; তবে রাষ্ট্র পরিচালনার গতিপথ, অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন বোঝার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষক, পরিবার, শিক্ষা, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি, প্রশাসন ও পররাষ্ট্রনীতিতে নানা উদ্যোগের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতে কর্মপরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় আছে। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশার কঠিন আয়নায় এসব উদ্যোগের মূল্যায়ন করতে গেলে অর্জনের পাশাপাশি কিছু অপূর্ণতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথম মন্ত্রিসভায় প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবারের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ, কৃষক কার্ড ও পরিবার কার্ডের উদ্যোগ, খাল পুনঃখনন, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধ-এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক। বিশেষ করে পরিবার কার্ডের মতো কর্মসূচি সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন ও স্বচ্ছ বিতরণ নিশ্চিত করতে পারলে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব, মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়ম থেকে এসব কর্মসূচিকে মুক্ত রাখাই হবে সরকারের প্রকৃত পরীক্ষা।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেলেও মানুষের স্বস্তি এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। মূল্যস্ফীতির হার কমা আর পণ্যের দাম কমা এক বিষয় নয়। তাই সরকারের নীতির লক্ষ্য শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো নয়, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো হওয়া উচিত। খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে সিন্ডিকেট ভাঙা, কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানো এবং বাজার তদারকিতে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা এখন সরকারের সবচেয়ে বড় জনমত-পরীক্ষা। রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি ইতিবাচক হলেও চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মব সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘাতের অভিযোগ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকারের উচিত অপরাধ দমনে কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা। পুলিশের পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও জনআস্থা পুনর্গঠনকে এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সরকারকে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাত বা কারিগরি ত্রুটি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারে, কিন্তু সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি, বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইভাবে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার শুধু প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ব্যাংক খাতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ আদায়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোকে পরবর্তী পর্যায়ের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-সরকারের নিজস্ব সাফল্যের হিসাবকে স্বাধীন ও পরিমাপযোগ্য সূচকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য ঘোষিত কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন, ব্যয়, উপকারভোগীর সংখ্যা এবং প্রত্যক্ষ ফলাফল নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে রাজনৈতিক বক্তব্যের বদলে তথ্যভিত্তিক জনজবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে।
আগামী ছয় মাস তাই আত্মতুষ্টির নয়, সংশোধন ও গতি বাড়ানোর সময়। সরকারকে তিনটি বিষয়ে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে-জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাজারে স্থায়ী স্বস্তি ফেরানো এবং তরুণদের জন্য দৃশ্যমান কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পাশাপাশি প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জনবান্ধব করতে হবে।
শেষ বিচারে একটি সরকারের সাফল্য কতটি সভা হয়েছে, কতটি কর্মসূচি ঘোষণা হয়েছে কিংবা কত শতাংশ বাস্তবায়নের দাবি করা হয়েছে-তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, বাজার কতটা সহনীয়, রাষ্ট্রীয় সেবা কতটা সহজ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষ কতটা আশাবাদী-তার ভিত্তিতে। ছয় মাসে সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে; এখন সেই উদ্যোগকে দৃশ্যমান জনকল্যাণে রূপ দেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত পরীক্ষা।
সানা/আপ্র/১৯/৮/২০২৬