একটি দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎব্যবস্থার দুর্বলতা কখনোই কেবল কারিগরি সংকট নয়। এর অভিঘাত সরাসরি পড়ে মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি, শিল্প, পরিবহন, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে। দীর্ঘ লোডশেডিং, গ্যাসের তীব্র ঘাটতি, শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ এবং জ্বালানির জন্য সড়ক অবরোধ-বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাই নিছক সাময়িক দুর্ভোগ নয়; এটি রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তার গভীর দুর্বলতার সতর্কসংকেত।
গ্রামাঞ্চলে কোথাও আট, কোথাও দশ, এমনকি ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষুব্ধ মানুষের হামলা ও ভাঙচুরের আশঙ্কায় দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ের নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে পুলিশের কাছে। এই ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা হলে সংকট কমবে না, বরং সীমিত সক্ষমতার সরবরাহব্যবস্থাই আরো বিপর্যস্ত হবে। জনরোষকে তাই আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার আগে এর পেছনের কারণ দূর করতে হবে।
চট্টগ্রামে গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে সিএনজি অটোরিকশাচালকদের সড়ক অবরোধ সেই ক্ষোভেরই আরেকটি বহিঃপ্রকাশ। কোথাও বাসাবাড়ির চুলা জ্বলছে না, কোথাও ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি, আবার হবিগঞ্জে ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হয়ে লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন বন্ধ মানে শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতি নয়; বিদেশি ক্রেতার আস্থা, রপ্তানি আদেশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও ঝুঁকিতে পড়া।
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে গ্যাসের ঘাটতি। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন, ভাসমান টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, বৈরী আবহাওয়া এবং বিভিন্ন কেন্দ্রে জ্বালানি ও যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা। অর্থাৎ একটি-দুটি আকস্মিক ঘটনার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়নি; দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা আকস্মিক ধাক্কাকে জাতীয় সংকটে পরিণত করেছে।
এখানে বর্তমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সালেও একই খাতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সময়ের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক রয়েছে। ফলে একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে তাঁকে পুনরায় কেন আনা হলো-এ প্রশ্ন এখন মানুষ ও বিশেষজ্ঞ মহল উভয়ের মধ্যেই উচ্চারিত হচ্ছে। অতীতের দায়িত্বের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে ব্যর্থ ঘোষণা করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি অতীতের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন না করেও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া প্রশ্নমুক্ত হতে পারে না। সরকারকে তাই ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের বদলে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টনের নজির স্থাপন করতে হবে।
তাৎক্ষণিক সংকট সামলাতে গ্যাস ও বিকল্প জ্বালানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে শিল্প, কৃষি, আবাসিক ও পরিবহন খাতে জ্বালানি বণ্টনের স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত অগ্রাধিকারনীতি প্রয়োজন।
মানুষের ক্ষোভ দমন করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; ক্ষোভের কারণ দূর করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিদ্যুৎ ও গ্যাস এখন বিলাসিতা নয়-এগুলো মানুষের জীবন, কৃষকের সেচ, শ্রমিকের কর্মসংস্থান, শিল্পের উৎপাদন এবং জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাই আজকের অন্ধকারকে সাময়িক দুর্ভোগ ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জ্বালানি নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এই সংকট একসময় বিদ্যুৎহীনতার সীমানা পেরিয়ে জাতীয় স্থিতিশীলতার সংকটে রূপ নিতে পারে।
সানা/আপ্র/১৫/৮/২০২৬