শামসুল আলম
অক্টোবরের প্রথম সকালেই মনে পড়ে যায় ২০০১ সালের কথা- অবাধ সুষ্ঠু ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোটের ক্ষমতায় আসার কথা। আওয়ামী শাসন অবসানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল- যা বর্তমানের কোনো মিডিয়া স্মরণ করে না।
যাই হোক, আজকের পরিস্থিতি এমন- রাষ্ট্র যেন নতুন জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে; এক হাতে বাংলা কিউআর, অন্য হাতে আইনশৃঙ্খলার খাতা। এখন থেকে বাংলা কিউআরে টাকা দিলে আর ব্যাংকের পথে হাঁটতে হবে না; পেমেন্ট শেষ, টাকা সোজা মার্চেন্টের হিসাবে। দুই হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনে প্রণোদনাও আছে, ব্যর্থ হলে টাকা ফেরত আসবে তাড়াতাড়ি। প্রযুক্তি বেশ ভদ্র জিনিস- কথা কম বলে, কাজটা করে ফেলে।
রাষ্ট্রের অন্য জানালায় অবশ্য গল্পটা একটু পুরোনো: নিউ গিনি প্রোপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় সাবেক এক মেজর জেনারেল গ্রেপ্তার হয়েছেন। অর্থাৎ একই দিনে একদিকে ‘ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট, অন্যদিকে ‘ইনস্ট্যান্ট অ্যাকশন’। নাগরিকের আবদারটিও খুব বেশি নয়- দুটোই যেন নিয়মিত হয়; শুধু কিউআরটি দ্রুত আর বিচারটা ধীরে ধীরে- এমন ভারসাম্য যেন না হয়!
কয়েকদিন আগে পালন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। মানুষের বয়স বাড়ে। কিন্তু তার গল্পের বয়স আরও বেশি। আমরা অবশ্য প্রবীণদের নিয়ে বক্তৃতায় বেশ দরাজ, বাস্তবে তাদের জন্য ফুটপাতের একটুখানি জায়গা ছাড়তে গেলেই হাঁপিয়ে উঠি। স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন-সবই দরকার; তার সঙ্গে দরকার একটু মর্যাদা, একটু ধৈর্য, আর পরিবারের লোকজনের মোবাইল থেকে মাথা তুলে একবার তাকানো। এরই মধ্যে বাংলাদেশের ক্রিকেট দল আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ও ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ খেলতে আমিরাতের পথে।
দেশের এক প্রজন্ম বয়সের সঙ্গে লড়ছে, আরেক প্রজন্ম রান ও উইকেটের সঙ্গে- জীবন বোধহয় এভাবেই একসঙ্গে কয়েকটি ম্যাচ খেলিয়ে নেয়। সামাজিক মাধ্যম আজও তার স্বভাব ছাড়েনি-খবরের সঙ্গে একটু মরিচ, একটু লবণ আর যথেষ্ট ঝাল। তিন মাস আগে হারিয়ে যাওয়া এক পাগল স্ত্রী সামাজিক মাধ্যমের কারণে তার স্বামীকে চেনার পরে আবেগঘন সাক্ষাতের দৃশ্য দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
অন্যদিকে রাকসুর জিএস অ্যারোগেন্ট সালাউদ্দিন আম্মারের ‘সাথী’ পদ হারানোর খবর ঘিরে শিবিরের অভ্যন্তরীণ চিঠি ও অভিযোগ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। সামাজিক মাধ্যমের সবচেয়ে বড় গুণ- তার স্মৃতিশক্তি অসাধারণ; সবচেয়ে বড় দোষ- সে অনেক সময় অভিযোগ, বক্তব্য ও প্রমাণকে একই থালায় পরিবেশন করে। তাই সেখানে কান খোলা রাখাই ভালো। কিন্তু বিচার-বুদ্ধিটাকে পাশে বসিয়ে চা খাওয়ানো আরও ভালো।
অর্থনীতির পাতাতেও আজ মানুষের পকেট ও ভবিষ্যৎ পাশাপাশি বসেছে। ইউরোপে, বিশেষত ইতালিতে বৈধ শ্রম অভিবাসনের সুযোগকে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কাজে লাগাতে ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’-এর মতো উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বিদেশে শুধু শ্রমিক নয়, দক্ষতারও রফতানি হবে- দেশের জন্য সেটি অনেক বেশি লাভের ব্যবসা। কিন্তু জাতীয় সঞ্চয়ের খবরটি একটু কম মিষ্টি, মানুষের ভোগব্যয় বাড়ছে। ফলে সঞ্চয় কমছে। আজকের বাজারে একটু বেশি হাসি পেতে গিয়ে আগামীকালের বিনিয়োগের মুখে যেন দীর্ঘশ্বাস না বসে। অর্থনীতির এই অঙ্ক বড় নিষ্ঠুর- টাকা একই, শুধু তার ঠিকানা বদলালেই ভবিষ্যৎ বদলে যায়। আজকের লেখাতেও নাগরিক জীবনের এ দু’প্রান্তেরই প্রতিধ্বনি।
দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস মনে করিয়ে দিয়েছে, উন্নয়নকে শুধু জিডিপি দিয়ে মাপলে মানুষের জীবনযাত্রার অনেকখানি হিসাবের বাইরে থেকে যায়; নীতি প্রণয়নে কোন তথ্য মাপছি, আর কোন তথ্য বাদ দিচ্ছি-সেটিও রাজনৈতিক অর্থনীতির বড় প্রশ্ন। আরেক সম্পাদকীয় শহর পরিকল্পনার দুরবস্থা-দখল করা ফুটপাত, এলোমেলো পার্কিং, যানজট, জলাবদ্ধতা ও একের পর এক রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির দিকে আঙুল তুলেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বড় স্বপ্নের পাশে নাগরিকের ছোট কষ্টটিও খাতায় তুলতে হবে; নইলে উন্নয়নের অঙ্কটি দেখতে বেশ সুন্দর হলেও যোগফলে মানুষটি কোথায় গেলেন, সেটাই বোঝা কঠিন।
দেশের সীমানার বাইরে অক্টোবরের প্রথম পাঠও জ্বালানির। ভারত ১ অক্টোবর থেকে ডিজেল ও এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল রফতানিতে উইন্ডফল কর কমিয়েছে-জ্বালানি রফতানি বাড়ানোই যার অন্যতম উদ্দেশ্য। আর রাশিয়া ডিজেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে; ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির প্রতিটি সিদ্ধান্তের ঢেউ বাংলাদেশের বাজারেও এসে লাগে। পৃথিবী এখন এমন এক পাড়ার নাম, যেখানে পাশের বাড়ির চুলায় আগুন কমবেশি হলে নিজের হাঁড়ির ভাতও একটু কাঁপে। তাই অক্টোবর নতুন খাতা খুলেছে বটে। কিন্তু পুরোনো প্রশ্নগুলো সঙ্গে নিয়েই- কৃষকের হাতে টাকা কত দ্রুত পৌঁছাবে, প্রবীণের জীবনে মর্যাদা কতা বাড়বে, দক্ষ তরুণের জন্য বিদেশের দরজা কতা খুলবে, আর রাষ্ট্রের হাত যখন শক্ত হবে, তখন তার হৃদয়টিও কি নরম থাকবে? নতুন মাসের কাছে এর চেয়ে সুন্দর প্রশ্ন আর কী-ই বা হতে পারে!
লেখক: সিনিয়র ব্যুরোক্রেট ও বিশ্লেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬