গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬

মেনু

এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পদ্ধতির সংস্কার প্রসঙ্গে

Super Admin

Super Admin

প্রকাশিত: ১০:০৬ পিএম, ১৭ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১১:০৭ এএম ২০২৬
এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পদ্ধতির সংস্কার প্রসঙ্গে
ছবি

শিক্ষামন্ত্রী

ওমর আলী: বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের জমানায় এমপি, এমপির পরিবার, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানসহ দলের নেতাদের এবং ডিসি ইউএনওদের সভাপতি করা হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে সভাপতি নিয়োগের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অপেশাদার, অযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে অশিক্ষিতরা নিয়োগ পেয়েছেন। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তহবিল ব্যবহারে যথেচ্ছাচার, শিক্ষক-কর্মচারি নিয়োগে অনিয়মসহ নানাভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতক ডিগ্রি করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতামন্ডলী ও শিক্ষক সমাজের সাথে আলোচনা না করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি সরকারে আসার পর সভাপতি পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলের ঘোষণা করায় ফের আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিগত অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর স্বৈরাচারের দোসর তকমা দিয়ে সারা দেশের সকল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বাতিল করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের দিয়ে এডহক কমিটি করে। তারপর গত বছরের ৩১ আগস্ট স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা চার বছর মেয়াদী স্নাতক পাস সভাপতি মনোনয়নের প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই প্রজ্ঞাপনে সভাপতি পদে নিয়োগের জন্য প্রথমে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয় পঞ্চম গ্রেড থেকে নবম গ্রেডের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাকে। তারপর যদি সরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পাওয়া না যায়, তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অথবা সহযোগি অধ্যাপককে সভাপতি করতে বলা হয়। যদি এই দুই ক্যাটাগরির উপযুক্ত ব্যক্তি ওই স্কুলের এলাকায় না থাকেন বা তারা আগ্রহী না হন, তাহলে প্রতিষ্ঠাতামন্ডলী থেকে সভাপতি মনোনীত করতে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। অধিকাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতামন্ডলীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী নেই। গ্রামাঞ্চলে-মফস্বলে অনেক সাধারণ কৃষক আছেন, স্কুলের জন্য বিনামূল্যে জমি দিয়েছেন, লাখ লাখ টাকা অনুদান দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, নিজেদের কষ্টার্জিত টাকায় বছরের পর বছর শিক্ষকদের বেতন দিয়েছেন, কিন্তু এই প্রজ্ঞাপনের ফলে তারা আর নিজের হাতে গড়া স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতে থাকতে পারছেন না।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, স্কুলের নামে জমি থাকতে হবে কমপক্ষে দুই একর। ক্লাস রুম, খেলার মাঠ, কমন রুম, টয়লেট, টিউবয়েল, শিক্ষক মিলনায়তন, প্রধান শিক্ষকের দফতর থাকতে হবে। তারপর অন্তত ১৫ বছর সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং বছর বছর ভালো ফলাফল হলেই কেবল এমপিওভুক্তির যোগ্য হয়। সরকারের বাজেট এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের সুপারিশের ভিত্তিতে আরো কমপক্ষে পাঁচ বছর পর এমপিওভুক্ত করা হয়। যারা প্রায় ২০ বছর ধরে স্কুল পরিচালনা করলেন, তাদেরকে এক কলমের খোঁচায় বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত মোটেও সঠিক নয়।

সারা দেশে নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং দাখিল-আলিম-ফাজিল-কামিল মাদ্রাসা মিলে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২৩ হাজার আর শিক্ষক-কর্মচারির সংখ্যা চার লক্ষাধিক। অন্তবর্তী সরকারের প্রজ্ঞাপন জারির পর গত ৭ মাসে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়নি। ডিসি, ইউএনওরা বর্তমানে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের এডহক কমিটির সভাপতি। শিক্ষকদের মাসিক বেতন বিলে তারা স্বাক্ষর করে দায়িত্ব শেষ করছেন। ডিসি-এডিসি-ইউএনওরা একেকজন ১৫-২০টি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। প্রশাসনের দৈনন্দিন কাজের চাপে তারা স্কুল ভিজিট করার সময়ও পাননা। তবুও তাদের ঘাড়ে স্থানীয় স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই যে এখন উচ্চ শিক্ষিত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাকে সভাপতি নিয়োগ করার কথা বলেছে, মাসিক মিটিংয়ে জেলা সদর থেকে সভাপতি যেদিন যাবেন, তার আপ্যায়ন ও যাতায়াত ভাতা কী সরকার বহন করবে? কিছু স্কুল আছে দোকানপাট, কনফারেন্স রুম, অডিটরিয়াম ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করে। অধিকাংশ স্কুলের নিজস্ব আয় নেই। এই ধরণের ব্যয় বহন করার অর্থ কে দেবে? বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে।

অন্তবর্তী সরকারের ঘোষিত প্রজ্ঞাপনে পরিচালনা পরিষদে সভাপতি ছাড়াও নারী-পুরুষ চারজন শিক্ষক প্রতিনিধি, মহিলাসহ চারজন অভিভাবক প্রতিনিধি, দাতা প্রতিনিধি, বিদ্যুৎসাহী প্রতিনিধি এবং প্রতিষ্ঠাতামন্ডলীর একজন প্রতিনিধিকে সদস্য হিসেবে রাখতে বলা হয়েছে। সদস্য সচিব করা হয়েছে প্রধান শিক্ষককে। কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন প্রধান শিক্ষক। স্কুল পরিচালনায় প্রতিষ্ঠাতাদের একেবারে গৌণ করা হয়েছে। একটা স্কুলের যদি ২০ জন প্রতিষ্ঠাতা থাকেন, তাহলে কমিটিতে পর্যায়ক্রমে থাকতে হলে কমপক্ষে ৬০ বছর লাগবে। তাই শিক্ষক প্রতিনিধির মতো সকল ক্যাটাগরিতেই চারজন সদস্য রাখা দরকার। স্কুলের পরিচালনা কমিটিতে প্রাক্তন ছাত্রদের থাকার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। অথচ প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের শিকড়ের সাথে যুক্ত রাখা হলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তারাও অবদান রাখতে পারেন। কমপক্ষে ১০ বছর আগে যারা পাস করে বেরিয়ে গেছেন, তাদের মধ্য থেকে অন্তত চার জনকে কমিটিতে রাখা দরকার।
বিদ্যমান প্রজ্ঞাপনের বহিরাগত সভাপতি নিয়োগ বাতিল করে প্রতিষ্ঠাতামন্ডলীর সদস্যদেরকে সভাপতি নিয়োগ করা হলে নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুল পরিচালনায় তারা আরো বেশি অবদান রাখতে পারবেন। প্রতিষ্ঠাতামন্ডলী বা তাদের পরিবারের সদস্যরা যদি সভাপতি হতে আগ্রহী না হন, তাহলে দাতা সদস্য, বিদ্যুৎসাহী সদস্য বা অভিভাবকরা সভাপতি হতে পারবেন মর্মে নীতিমালা করা উচিত। ডিসি, এমপির প্রতিনিধি, মেয়র-চেয়ারম্যানদের সভাপতি করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায়। পরিচালনা করেন প্রধান শিক্ষক। পরিচালনা পরিষদের অবৈতনিক সভাপতি কিংবা সদস্যরা ক্লাস নেন না, সিলেবাস করেন না। শিক্ষক কর্মচারি নিয়োগ দেয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। শিক্ষকদের বেতন-বোনাস সরাসরি সরকারি তহবিল থেকে শিক্ষকদের ব্যাংক একাউন্টে জমা হয়। কেবলমাত্র স্কুল পরিচালনায় শিক্ষকদের সহযোগিতা করাই কমিটির কাজ। কমিটিতে উপরোক্ত স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের সংযুক্ত করলেই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ তদারকিসহ সকল বিষয়ে তারা অবদান রাখতে পারবেন। ছাত্র-শিক্ষক, প্রতিষ্ঠাতা ও অভিভাবক সবাই এক সাথে কাজ করতে পারলেই শিক্ষার মান উন্নয়ন হবে বলে আমার বিশ্বাস।
লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও কলাম লেখক, ঢাকা।
omarali1971@gmail.com
সানা/আপ্র/১৭/৩/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকি ও পরিণতি
০৭ মার্চ ২০২৬

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকি ও পরিণতি

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকারমার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এ...

ভূমির বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভূমির বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার======ভূমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থ’ার সবচেয়ে দীর্ঘস...

প্রত্যাশিত গণরায়, বাংলাদেশে নতুন সরকার এবং উন্নয়ন ও সুশাসনে করণীয়
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রত্যাশিত গণরায়, বাংলাদেশে নতুন সরকার এবং উন্নয়ন ও সুশাসনে করণীয়

জগদীশ সানা: শেষ হলো বাংলাদেশের প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন।  যাত্রা শুরু করলো নতুন সরকার। জাতীয় ন...

গণরায়ের ম্যান্ডেট ও রাষ্ট্রসংস্কারের অনিবার্যতা
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

গণরায়ের ম্যান্ডেট ও রাষ্ট্রসংস্কারের অনিবার্যতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের গণঅভ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই