ভেজাল, ভেজাল, ভেজাল রে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায়,
ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকো চেষ্টায়।
ভেজাল তেল আর ভেজাল চাল, ভেজাল ঘি আর ময়দা,
‘কৌন ছোড়ে গা ভেজাল ভেইয়া, ভেজালসে হায় ফয়দা।
ভেজাল পোশাক ভেজাল খাবার, ভেজাল লোকের ভাবনা,
ভেজালেরই রাজত্ব এ পাটনা থেকে পাবনা।
ভেজাল কথা-বাংলাতে ইংরেজি ভেজাল চলছে,
ভেজাল দেওয়া সত্যি কথা লোকেরা আজ বলছে।
‘খাঁটি জিনিস’ এই কথাটা রেখো না আর চিত্তে,
‘ভেজাল’ নামটা খাঁটি কেবল আর সকলই মিথ্যে।
কলিতে ভাই ‘ভেজাল’ সত্য ভেজাল ছাড়া গতি নেই,
ছড়াটাতেও ভেজাল দিলাম, ভেজাল দিলে ক্ষতি নেই।
উপরের কবিতাটির নাম ‘ভেজাল’; কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই কবিতা কেবল সাহিত্যিক ব্যঙ্গ নয়; এটি ছিল এক সামাজিক অসুখের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। এই রচনার প্রায় আট দশক পর সেই একই পঙ্ক্তি আজ আর কেবল কবিতার অংশ নয়-এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বাস্তবতার এক নির্মম স্বীকৃতি।
তবে পার্থক্য একটাই। সুকান্তের সময় ভেজাল ছিল বিচ্ছিন্ন অসাধুতা; আজ তা একটি প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক ও সরবরাহ-শৃঙ্খলভিত্তিক ঝুঁকি। খাদ্য এখন শুধু পুষ্টির উৎস নয়-এটি একদিকে জীবনরক্ষাকারী উপাদান, অন্যদিকে নীরব মৃত্যুঝুঁকির বাহক।
বৈশ্বিক সতর্কতা: WHO–FAO–World Bank দৃষ্টিভঙ্গি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছে যে অনিরাপদ খাদ্য একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী-
* প্রতি বছর প্রায় ৮৬ কোটি মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়
* প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে অনিরাপদ খাদ্যজনিত কারণে
* ২০০টিরও বেশি রোগ খাদ্য দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত-
বিশেষত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার।
FAO (Food and Agriculture Organization) বলছে, নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা না থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা (food security) অর্থহীন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; সেটি নিরাপদ হতে হবে। বিশ্বব্যাংকের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যবাহিত রোগ ও দূষণের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো বছরে বিপুল পরিমাণ উৎপাদনশীলতা হারায় এবং স্বাস্থ্যব্যয়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়-যা অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশে নীরব সংকটের বিস্তার: বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) গঠিত হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু বাস্তবে এখনো খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন-
* পরীক্ষাগার ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি
* স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাব
* সরবরাহ শৃঙ্খলে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ
* অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া।
ফলে খাদ্য নিরাপত্তা একটি প্রতিক্রিয়াশীল (reactive) ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি এখন অসংক্রামক রোগ (NCDs), যার বড় অংশ খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্য দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভেজালের পরিবর্তিত চরিত্র এখন এটি শিল্প: একসময় ভেজাল ছিল দুধে পানি মেশানো বা ওজনে কম দেওয়া। আজ এটি একটি প্রযুক্তিনির্ভর, লাভকেন্দ্রিক শিল্পে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতা হলো-
* ফল পাকাতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল
* শাকসবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক
* মাছ-মাংস সংরক্ষণে নিষিদ্ধ প্রিজারভেটিভ
* মিষ্টি ও বেকারিপণ্যে কৃত্রিম রং ও ফ্লেভার। এটি আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক প্রণোদনা-চালিত বাজারব্যবস্থা সমস্যা।
খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন: খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় কেবল সরবরাহ নয়, চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ। নগরায়ণ ও জীবনধারার পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে-
* ফাস্টফুডের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে
* অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্য জনপ্রিয় হয়েছে * চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাট গ্রহণ বেড়েছে।
WHO বারবার সতর্ক করেছে যে-অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্সফ্যাট গ্রহণ হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং ডায়াবেটিসের প্রধান ঝুঁকি উপাদান। অর্থাৎ আমরা একই সঙ্গে দুই দিক থেকে ঝুঁকির মধ্যে আছি- ভেজাল খাদ্য + অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।
স্বাস্থ্যগত-অর্থনৈতিক প্রভাব ও দারিদ্র্যের নতুন চক্র: বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উচ্চ স্বাস্থ্যব্যয় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
একটি পরিবার যখন-
*দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হয় যেমন-অসংক্রামক রোগ ((NCDs) বৃদ্ধি (ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসার)
*নিয়মিত চিকিৎসা ব্যয় বহন করে * আয়ের বড় অংশ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করে-
*উৎপাদনশীলতা হ্রাস * দারিদ্র্য পুনরুৎপাদন। অর্থাৎ সেটি শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক পতনের চক্র।
মূল চ্যালেঞ্জসমূহ--------------
* খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ
* ভেজাল ও রাসায়নিক ব্যবহারের প্রসার
* সীমিত পরীক্ষাগার ও মনিটরিং সক্ষমতা
* ভোক্তা সচেতনতার অভাব
* প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় ঘাটতি।
সমস্যা সংক্ষেপ: বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এখন একটি বহুমাত্রিক সংকট, যা জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে। WHO I FAO--এর তথ্য অনুযায়ী, অনিরাপদ খাদ্য বৈশ্বিকভাবে কোটি কোটি মানুষকে আক্রান্ত করছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর অর্থনৈতিক ক্ষতি বিপুল।
ভোক্তা অধিকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া: ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান চালালেও তা মূলত অভিযাননির্ভর এবং সময়ভিত্তিক। ফলে এর প্রভাব সীমিত। একইভাবে BFSA এখনও পুরোপুরি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি স্পষ্ট ফাঁক রয়ে গেছে- নীতি আছে, কিন্তু সক্ষম বাস্তবায়ন কাঠামো দুর্বল।
নীতিগত করণীয় কাঠামোগত সংস্কার--------------
১. সম্পূর্ণ খাদ্য সরবরাহ ট্রেসেবিলিটি-উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
২. ইঋঝঅ শক্তিশালীকরণ-স্বাধীন, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গড়ে তুলতে হবে।
৩. দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি-ভেজালকে সাধারণ অপরাধ নয়, জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৪. ল্যাব নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ-জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পরীক্ষাগার স্থাপন জরুরি।
৫. জনসচেতনতা ও শিক্ষা-স্কুল পর্যায় থেকে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা মানে রাষ্ট্রের সক্ষমতা: সুকান্তের কবিতার ‘ভেজাল’ আজ কেবল সাহিত্য নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা। তবে খাদ্য নিরাপদ না হলে-
* স্বাস্থ্য নিরাপদ নয়
* অর্থনীতি স্থিতিশীল নয়
* উন্নয়ন টেকসই নয়।
অতঃপর প্রজন্ম রক্ষার শপথ: নিরাপদ খাদ্য কোনো বিকল্প নীতি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার কেন্দ্রীয় সূচক। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি-সবই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। অতএব ভেজালের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল প্রশাসনিক অভিযান নয়-এটি একটি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, একটি জনস্বাস্থ্য যুদ্ধ এবং একটি প্রজন্ম রক্ষার শপথ।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আজকের প্রত্যাশা
সানা/আপ্র/১০/৬/২০২৬