মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে বড় পরিসরের সামরিক হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মজুত দ্রুত কমে আসার আশঙ্কা এই সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান কারণ।
প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর আগে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন বিভিন্ন কৌশলগত ঝুঁকি পর্যালোচনা করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত।
গত শুক্রবার ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পরই ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে পরিবর্তন আসে বলে জানিয়েছে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা জানান, বৈঠকে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দ্রুত হ্রাস পাওয়া মজুত। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, শুক্রবার জর্ডানে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার সময় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এতে তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আরো বড় সামরিক অভিযান চালানো হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে জেনারেল কেইনের মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিউং বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময় কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে হামলা অব্যাহত রাখে অথবা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু বানায়, তাহলে সব ধরনের বিকল্পই বিবেচনায় থাকবে।
তিনি আরো বলেন, কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও ধারাবাহিক সামরিক চাপের পরও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোই ইরানের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ হতে পারে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলমান সংঘাত কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল কীভাবে পুনঃস্থাপন করা যাবে, তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সংঘাত তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধ আরো বিস্তৃত হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানসহ যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা আরো বড় ঝুঁকিতে পড়বে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং শরণার্থী সংকটও আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া সূত্রগুলোর দাবি, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ অধিকাংশ উপদেষ্টা এই মুহূর্তে সামরিক অভিযান আরো বিস্তৃত করার পক্ষে নন। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি; বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য আরো সুসংহত হয়েছে এবং দেশটির নেতৃত্ব বহিরাগত হুমকিকে সামনে এনে অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে পেরেছে।
টানা দুই সপ্তাহের সংঘাতের পর শনিবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়। তবে পরিস্থিতি এখনো উত্তেজনাপূর্ণ। কারণ ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি এবং সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।
বৈঠকের আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র আরো বড় সামরিক অভিযান চালাতে প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও খোলা রাখার কথা জানান।
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় হামলার অনুমোদন দেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন। কিন্তু সামরিক উপদেষ্টাদের সতর্কবার্তার পর শুক্রবার রাতেই সেই পরিকল্পনা স্থগিত করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোতায়েন মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের ধারাবাহিক হামলার কারণে বিপুলসংখ্যক প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে। ফলে বড় ধরনের নতুন হামলা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত এপ্রিলের শেষ দিকে নিউইয়র্ক টাইমস-এর আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চলমান সংঘাতে পেন্টাগন এক হাজার ২০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। প্রতিটির মূল্য ৪০ লাখ ডলারের বেশি। কংগ্রেস ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, এসব অস্ত্রের মজুত এখন উদ্বেগজনকভাবে কমে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারসহ প্রশাসনের একাংশের মত হলো, সরাসরি যুদ্ধ আরো বাড়ানোর পরিবর্তে ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা এবং কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়াই অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির কৌশল হতে পারে।
এদিকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়েছে। তাঁর দাবি, এতে ইরানের তেল রপ্তানি থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জুনের মাঝামাঝি সমঝোতা স্মারকের পরও ইরান সীমিত পরিসরে, বিশেষ করে চীনের কাছে, তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সানা/আপ্র/২৭/৭/২০২৬