ইরাজ আহমেদ
পাখিদের দল থেকে একটি দুটি করে পাখি হারিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত উধাও হয়ে যাচ্ছে তারা। রূপকথার গল্পের কোনো ভয়ংকর জাদুকর তাদের উধাও করে দিচ্ছে। নাকি হ্যামিলন শহরের অসংখ্য বাঁশিওয়ালা এসে হাজির হয়েছে? ইঁদুরদের উধাও করে দেওয়ার পর এবার এসে তারা শিশুদের নিয়ে চলে যাচ্ছে কোনো এক অজানা অরণ্যের দিকে? বিষয়টি রূপকথার গল্পের মতো রূপক আর রোম্যান্টিসিজমে ঠাসা কোনো বহুল সমাদৃত গল্প নয়। ঘটনাগুলো ভয়ংকর বাস্তব, ভীষণভাবে উদ্বেগজনক।
গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে বাংলাদেশে ১৫,৭৭১ শিশু নিখোঁজ হওয়ার সাধারণ ডায়েরি বা তথ্য পাওয়া গেছে। চমকে ওঠার মতো খবর। এই খবরে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ প্রশাসনও। তড়িঘড়ি করে তারা জানিয়েছে, এই ১৫ হাজারের বেশি নিখোঁজ হওয়া শিশুর মধ্যে ১৩,৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যের সহজ বিশ্লেষণ বলে দেয়, উদ্ধার হওয়া শিশুদের বাইরে এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু রয়ে গেছে যাদের এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার না হওয়া শিশুরা হারিয়ে গেছে কোন অরণ্যে?
পুলিশ সাত মাসে এত শিশু নিখোঁজ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ দেখতে পেয়েছে। তাদের বিশ্লেষণ বলছে, শিশুদের বেশিরভাগই বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তা চিনে ফিরতে পারেনি। আবার কেউ বাড়ি থেকে অভিমান করে চলে গেছে। কেউ পালাতে চেয়েছে লেখাপড়ার চাপ এড়াতে।
ঘটনাটি খবরের কাগজের পৃষ্ঠায় অথবা কোনো টেলিভিশনের সংবাদে পরিবেশিত অসংখ্য খবরের পুকুরে সামান্য আলোড়ন তুলে আবার হারিয়েও গেছে। কিন্তু কারও কারও মনে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা থেকেই গেছে। কেউ বলবেন, শিশুদের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা এই জনপদে নতুন নয়। রেকর্ডপত্র ঘেঁটে এরকম অনেক উদাহরণ উপস্থিত করা সম্ভব। তাদের বক্তব্য মিথ্যা নয়। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, বছরের মাত্র সাত মাস সময়ের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা।
এখানে কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সম্ভাবনা খোঁজার প্রয়োজন নেই। পরিবর্তে এই ভয়ংকর চিত্রটি আমাদের সমাজে শিশুদের ভবিষ্যৎ, তাদের পরিবারগুলোর অবস্থাকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করায়। নিখোঁজ হওয়া শিশুরা সমাজে একা বসবাস করে না। তাদের ঘরবাড়ি আছে, বাবা-মা আছে, স্বজন আছে। তাদের নিখোঁজ হওয়া এবং আর ফিরে না পাওয়া সেই পরিবারগুলোকেও নিক্ষেপ করেছে গভীর অন্ধকারে। উদ্ধার না হওয়া বাকি শিশুদের পরিণতি কী হয়েছে তাও আমরা কেউ জানি না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কি জানে? কোনো চক্র যদি পরিকল্পিতভাবে এই শিশুদের অপহরণ করে থাকে তাহলে তাদের কেউ আটক হয়নি এখনো। পুরোনো খবর খুঁজে দেখলে পাওয়া যাবে শিশু নিখোঁজের পেছনে এ ধরনের চক্রের সক্রিয় ভূমিকা ছিল আগেও। শুধুই কি শিশু উধাও হয়ে যাওয়ার খবরটাই উদ্বেগের? তাহলে কন্যাশিশু ধর্ষণ অথবা ছেলেশিশুদের ওপর কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চালানো শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো সমাজে কী ধরনের ক্ষতচিহ্ন বহন করছে? প্রতিবাদের ভাষায় সরব হয়ে উঠছে হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টক শো-এর টেবিল ছড়াচ্ছে তর্কের উত্তাপ, পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হচ্ছে নিন্দা আর ব্যবস্থাগ্রহণের আর্তি। কিন্তু কী সেই ব্যবস্থা? প্রতিবাদের প্রকৃত ধরনটাইবা কেমন?
এই সমাজে বেড়ে ওঠা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক সুসংগঠিত ভাবনা উচ্চারিত হয়। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা উদ্বেগও প্রকাশ করি অহরহ। কিন্তু এই সমাজে তাদের বেঁচে থাকার প্রকৃত পরিস্থিতি কেমন তা নিয়ে আমাদের ভাবনায় কোথায় যেন কমতি থেকে যায়। কারণ আমরা সমস্যা বা সংকটের ওপর কোনো কিছুর প্রলেপ দিয়ে দ্রুত ধামাচাপা দিতে চাই সমস্যার কেন্দ্র। কিন্তু এই ওষুধে তো রোগ সারার কোনো কোনো কারণ নেই। এই রোগ একটু একটু করে সমাজকে আচ্ছন্ন করেছে এবং উচ্ছন্নের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চাইছে। এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়া শিশু বা তাদের পরিবারের অবস্থা কি আমরা ভেবেছি? ভয়ংকর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে যারা এখানেই রয়ে গেল তাদের মানসিক সংকট আর বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে কী অতল অন্ধকার জমে রইল সেদিকে নজর দিচ্ছি?
শিশু নিখোঁজের বিষয়ে পুলিশের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, তাদের কেউ কেউ অভিমান করে বাড়ি থেকে চলে যায়। আবার কেউ পড়াশোনার চাপ সামলাতে না পেরে বাড়ি থেকে পালায়। শিশুদের অভিমানের জায়গাটা কোথায়? বিষয়টা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে না বোধ হয়। এই সমাজের ভেতরে মানুষের প্রতিদিনের জীবনধারনের সংকট আছে, জীবিকার সংকট আছে, বেকারত্ব আছে। এসব কারণে বাড়ছে অপরাধ। এই কারণগুলোর চাপ শিশুদের মনের ওপর পড়ছে। সেখান থেকেই কি শৈশবেই তারা ঘর বিমুখ হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো সহজেই করা যায়। কিন্তু উত্তর খোঁজার প্রক্রিয়াটি কঠিন। প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা কি সত্য সত্যই সেই খোঁজ নিতে চাই? আসলে আমরা এমন এক সমাজ কাঠামো শিশুদের সামনে দৃষ্টান্ত হিসেবে রাখছি যেখানে মানবিকতার পরিমাণ ক্রমশ কমে আসছে অথবা কমে গেছে।
শিশুদের মনোজগতের অবস্থান নির্ণয়ের জায়গায় আমরা বোধহয় সবচেয়ে বেশি উদাসীন। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিখোঁজ হওয়া শিশুদের বড় অংশের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছর। এটি এমন এক বয়স- যখন তাদের মানসিক ও শারীরিক রূপান্তর ঘটে। এই সময়ে তাদের ওপর পরিবার অথবা সমাজের দিক থেকে যখন চাপ তৈরি হয়, তারা অবহেলা অনুভব করতে থাকে, নিজের চেনা চৌহদ্দিটাকেই প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শুরু করে। ফলে তার মধ্যে তৈরি হয় ‘পলায়নমনোবৃত্তি’।
একটা শিশু যদি নিজে নিজেও গৃহত্যাগী হয়, তাহলে সেখানে শুধু আবেগ নয়; কাজ করে তীব্র মানসিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা। আবার অন্যদিকে শিশুটি যদি অপহরণ বা পাচারের শিকার হয়, তাহলে সেটিও তার মনে তৈরি করে স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন। তাই ফিরে আসা শিশুদের পরিসংখ্যান উপস্থাপিত হলেও সামাজিকভাবে আমরা কেউই তার দায় এড়াতে পারি না। প্রকাশিত খবরের সূত্র অনুযায়ী যে দুই হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ রয়ে গেছে তাদের কেন কোনো মহলই রক্ষা করতে সমর্থ হলো না তা একটি বড় প্রশ্ন হয়েই থেকে যাবে।
আমরা শিশুদের ‘ভবিষ্যৎ নাগরিক’ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। কিন্তু তাদের বর্তমানই সমাজের মধ্যে অনিরাপদ হয়ে আছে। একটা শিশুও যখন হারিয়ে যায় তাকে নিয়ে আসা হয় পরিসংখ্যানের আওতার মধ্যে। কিন্তু তা যে গোটা সমাজের জন্য রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে ওঠে সেটা বোঝার চেষ্টাটাই হারিয়ে যায় ব্যাখ্যা আর হিসাবের আড়ালে। শিশুদের সফল পরিণতি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে। কিন্তু আমরা এখন বসে নির্ণয় করার চেষ্টা করছি এই নিখোঁজ শিশুরা কোন অরণ্যে হারিয়ে যাচ্ছে? তাদের কোন জাদুতে উধাও করে দিচ্ছে কোন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা?
রূপকথার গল্প আসলে তো শুধু গল্প নয়। সেখানে কাহিনির আড়ালে থাকে বহু ইঙ্গিত, যা আমরা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই। আর ব্যর্থ হই বলে সমাজের ভেতরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তাদের অবস্থান সামাজিকভাবে অনিরাপদ থেকে যায়।
লেখক: কবি
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৯.০৯.২০২৬