বাংলাদেশে দুই দশক ধরে অলিম্পিয়াড আন্দোলন বেশ জনপ্রিয়। গণিত অলিম্পিয়াড থেকে শুরু করে দেশে এখন ২৪-২৫ ধরনের অলিম্পিয়াড চালু আছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা অলিম্পিয়াডে ভালো করছে, অনেক শিক্ষার্থী অলিম্পিয়াডে অংশ নিচ্ছে।
আজকের বিশ্বে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই ট্যাব, স্মার্টফোন আর টেলিভিশনের স্ক্রিনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠছে। পড়াশোনা থেকে শুরু করে বিনোদন সবক্ষেত্রেই ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এই আধুনিক পরিবর্তন শিশুদের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি ডেকে এনেছে মারাত্মক এক অদৃশ্য সংকট।
গবেষকদের মতে, শিশুরা কেন এত বেশি স্ক্রিনের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং কোন ধরনের কনটেন্ট তারা বেশি দেখছে, তা আজ গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুধীর কুমার মুপ্পালার গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই আসক্তির কারণে শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।
অনেক আগে থেকেই শিশুরা মূলত কার্টুন, অনলাইন গেম, আর শর্ট-ভিডিও প্ল্যাটফর্মের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে এই বিষয়টি বেশি দেখা যাচ্ছে। ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো মাধ্যমে দ্রুত পরিবর্তনশীল রঙিন চিত্র ও শব্দ শিশুদের মস্তিষ্কে এক ধরনের ডোপামিন হরমোন তৈরি করে। এতে তারা বারবার স্ক্রিনের সামনে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা প্রতিদিন প্রয়োজনের চেয়ে বহুগুণ বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে। ঢাকা শহরের শিশুদের ওপর পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি’র গবেষক ড. শাহরিয়া হাফিজ কাকন ও তার দল এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেছেন। জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ হিউম্যান ফ্যাক্টরস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৮৩ শতাংশই প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী এই বয়সী শিশুদের জন্য বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দিনে দুই ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা স্মার্টফোন, টেলিভিশন ও ট্যাবলেটের পেছনে ব্যয় করছে। এই দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকার ফলে শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গবেষক দলটি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২১ জন শিশুর ওপর এই গবেষণা পরিচালনা করেন, যা আমাদের সমাজব্যবস্থার এক করুণ বাস্তবতাকে উন্মোচন করেছে।
অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। প্রশান্ত ভি কারিয়া, রিনাম এন দোশি এবং অমিত এস জৈন পরিচালিত ক্রস-সেকশনাল গবেষণায় স্ক্রিন আসক্তির সঙ্গে শিশুদের আচরণগত সমস্যার গভীর যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
চারজন শিশুর মধ্যে প্রায় ১ জন শিশু ঘুমের ঘাটতি, স্থূলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথার শিকার হচ্ছে। এছাড়া প্রায় দুই পঞ্চমাংশ শিশু অতিরিক্ত উদ্বেগ, হাইপারঅ্যাক্টিভিটি বা অতিচঞ্চলতা এবং মানসিক অবসাদের মতো সমস্যায় ভুগছে। স্ক্রিনের অতিরিক্ত নীল আলো শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ঘুমের চক্রকে বাধাগ্রস্ত করে, যার ফলে তারা রাতে সময়মতো ঘুমাতে পারে না এবং দিনভর ক্লান্তিতে ভোগে।
প্রয়াস ইনস্টিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ফাতিমা মেঘলা বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুসহ সাধারণ শিশুদের ক্ষেত্রেও স্ক্রিন আসক্তি আজ এক নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। আমাদের কাছে থেরাপিতে আসা অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে তাদের মধ্যে অটিজম সদৃশ লক্ষণ বা স্পিচ ডিলে (ভাষা প্রকাশে বিলম্ব) তৈরি হচ্ছে। অবিরাম অ্যানিমেশন ও স্ক্রিনের ফ্ল্যাশিং লাইট শিশুদের মনোযোগের পরিধি মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে ক্লাসরুমে শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা কিংবা সাধারণ নির্দেশ বুঝতে শিশুদের প্রচণ্ড কষ্ট হয়। অভিভাবকদের এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও সচেতন হতে হবে, যাতে শিশুরা কোনোভাবেই বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্যাজেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। বিশেষ শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের উচিত শিশুদের বহুমুখী কায়িক ও সংবেদনশীল কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ভাষা মানুষের মনন ও সংস্কৃতির বাহক। কিন্তু আজকের ডিজিটাল আগ্রাসন শিশুদের মাতৃভাষা ও পঠনভ্যাস থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। শিশুরা স্ক্রিনে বেশি সময় কাটানোর ফলে বই পড়ার অভ্যাস বা মননশীল চর্চা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
অনলাইন কনটেন্টের ভাষা প্রায়শই অগভীর ও যান্ত্রিক হয়ে থাকে, যা শিশুদের শব্দচয়ন ও বাক্য গঠনের ক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। ভাষা শেখার ক্ষেত্রে অনুকরণ এবং ভাবের আদান-প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা একটি নিথর স্ক্রিনের পক্ষে কখনোই প্রদান করা সম্ভব নয়।
শিশুদের যদি আমরা বইমুখী না করি এবং তাদের নিজস্ব ভাষায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চায় না আনি, তাহলে আমাদের আগামী প্রজন্ম নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক পর্যায়ে এখনই কঠোর ভাষিক ও ডিজিটাল নীতিমালার প্রয়োগ প্রয়োজন। স্ক্রিন মিডিয়ার মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বা কগনিটিভ বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যখন একটি শিশু দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে, তখন তার সামাজিক ও আবেগীয় যোগাযোগের সুযোগ কমে যায়।
অন্য একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্ক্রিনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর ফলে শিশুদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং তাদের একাডেমি পারফরম্যান্স খারাপ হতে থাকে। মানুষের মুখের ভাষা ও আবেগের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি বোঝার ক্ষমতা এই ডিজিটাল আসক্তির কারণে ভোঁতা হয়ে যায়। ফলে শিশুরা বাস্তব জীবনে অন্যদের সঙ্গে মিশতে ভয় পায় এবং তাদের মধ্যে একধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।
ওই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো প্রযুক্তির সম্পূর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা নয়, বরং একটি সুস্থ ও সুষম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার বিভাগের অধ্যাপক ড. হাকিম আরিফ বলেন, ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার কেবল শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে না, এটি শিশুদের ভাষা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এক মারাত্মক ব্যাধি বা কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার তৈরি করছে।
বর্তমান যুগে শিশুরা যখন মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার চেয়ে ইউটিউব বা কার্টুনের সঙ্গে বেশি সময় কাটাচ্ছে, তখন তাদের শব্দভাণ্ডার ও ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টারঅ্যাকশন ছাড়া শিশুর ভাষা কখনো স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারে না।
স্ক্রিনভিত্তিক ভার্চুয়াল জগৎ শিশুদের একমুখী যোগাযোগ শেখায়, যা তাদের বাস্তব জীবনের সামাজিক ও ভাষিক দক্ষতাকে অবলুপ্ত করে দিচ্ছে। এই সংকট থেকে রক্ষা পেতে হলে পরিবারে পারস্পরিক কথোপকথন এবং সামনাসামনি যোগাযোগের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে, অন্যথায় আগামী প্রজন্ম এক গুরুতর যোগাযোগগত সংকটের মুখে পড়বে।
বর্তমান যুগে শিশুরা যখন মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার চেয়ে ইউটিউব বা কার্টুনের সঙ্গে বেশি সময় কাটাচ্ছে, তখন তাদের শব্দভাণ্ডার ও ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টারঅ্যাকশন ছাড়া শিশুর ভাষা কখনো স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারে না।
অনলাইন কনটেন্ট বিশ্লেষক নুরুন্নবী চৌধুরী হাছিব বলেন, বর্তমান অনলাইন কনটেন্ট ইকোসিস্টেম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা শিশুদের আসক্ত করতে বাধ্য করে। অ্যালগরিদমগুলো শিশুদের প্রবৃত্তি ও মনোযোগকে টার্গেট করে একের পর এক আসক্তিমূলক ভিডিও বা গেম পরিবেশন করে চলে। কনটেন্ট নির্মাতারা ভিউ ও এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙ, দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন এবং হাইপার-স্টিমুলেটিং সাউন্ড ইফেক্ট ব্যবহার করছেন, যা কোমলমতি শিশুদের মস্তিষ্কের নিউরোলজিক্যাল প্যাটার্নকে ওলটপালট করে দিচ্ছে।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ মনে করেন, শিশুদের জন্য সঠিক সীমারেখা টেনে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের নিয়মিত আউটডোর গেমস বা খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, দলগত পঠন এবং গাছের যত্ন নেওয়ার মতো সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা। এ ছাড়া চোখের সুরক্ষার জন্য ‘২০-২০-২০’ নিয়ম মেনে চলা উচিত—অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরে কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে চোখকে বিশ্রাম দেওয়া।
একজন গবেষক হিসেবে বলতে পারি, শিশুদের ডিজিটাল আসক্তি আজ আর ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট। গবেষক ও চিকিৎসকদের মতে, বাবা-মায়ের সচেতনতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া এই অদৃশ্য মহামারি রোধ করা সম্ভব নয়।
শিশুদের হাতে প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিবার, বিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সময় এসেছে আমাদের শিশুদের একটি সুন্দর, সুস্থ ও স্ক্রিন-মুক্ত শৈশব উপহার দেওয়ার, যাতে তারা আগামীর দিনে শারীরিক ও মানসিকভাবে পূর্ণাঙ্গ বিকশিত এক দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
কেএমএএ/আপ্র/০৯.০৯.২০২৬