একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মহানগরীতে নির্মাণ করা হয়েছে আরেকটি অত্যাধুনিক বাস ও ট্রাক টার্মিনাল। নগরের জালালাবাদ ওয়ার্ডের কুলগাঁও বালুচরা এলাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ৮ দশমিক ১০ একর জায়গার ওপর নির্মিত এই টার্মিনালে ব্যয় হয়েছে জমি অধিগ্রহণসহ প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা। চলতি মাসে উদ্বোধনের পর টার্মিনালটি পুরোদমে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কদমতলী ও বহদ্দারহাটের পর এটি হবে চট্টগ্রাম মহানগরীর তৃতীয় বাস টার্মিনাল।
জানা গেছে, ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম নগরের প্রথম বাস টার্মিনাল নির্মিত হয় কদমতলীতে। দ্বিতীয়টি নির্মিত হয় ১৯৯৩ সালে বহদ্দারহাটে। এরপর দীর্ঘ ৩৩ বছরেও নগরে আর কোনো বাস টার্মিনাল নির্মিত হয়নি। কুলগাঁও সিটি বাস টার্মিনাল প্রকল্পটি ২০১৮ সালের অক্টোবরে অনুমোদন পেলেও নানা জটিলতায় প্রায় আট বছর লেগেছে এর নির্মাণকাজ শেষ করতে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে ১০৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ভূমি উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৩৭ লাখ, অবকাঠামো উন্নয়নে ৭ কোটি ৫০ লাখ এবং ইয়ার্ড নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা। এসব খাতে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। জমি অধিগ্রহণসহ প্রকল্পটির সর্বমোট ব্যয় প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা।
টার্মিনালটিতে দূরপাল্লার ও আন্তঃনগর—দুই ধরনের বাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকবে। বাসের পাশাপাশি ট্রাক রাখার জন্যও পৃথক জায়গা রাখা হয়েছে। মোট ১৬০টি বাস ও ট্রাক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্পের মূল অবকাঠামোর কাজ প্রায় শেষ। বর্তমানে মূল ভবনের শেষ পর্যায়ের কাজ, সৌন্দর্যবর্ধন ও বাগান তৈরির কাজ চলছে। প্রবেশপথে রয়েছে তিনতলা একটি ভবন। টার্মিনাল এলাকায় একটি সিটি বাস টার্মিনাল ও একটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনালের পাশাপাশি ২৫টি যাত্রী ওঠানামার লেন এবং ১৪টি অতিরিক্ত অপেক্ষমাণ লেন রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বড় খোলা হলরুম ও তথ্যকেন্দ্র, নারী ও পুরুষের পৃথক শৌচাগার, ২২টি টিকিট কাউন্টার, যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা, তারহীন ইন্টারনেট সুবিধা, মালামাল রাখার কক্ষ, ট্যাক্সি বুকিং কক্ষ, প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র, রেস্তোরাঁ, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের যাত্রীদের জন্য পৃথক বসার স্থান, বাস-ট্রাক মালিকদের কার্যালয় এবং বাসকর্মীদের আবাসন কক্ষ থাকছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল বলেন, কুলগাঁও বালুচরা বাস টার্মিনালসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মেয়র দু-এক দিনের মধ্যে দেশে ফিরলে এগুলো চালু বা উদ্বোধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। খুব শিগগিরই বাস টার্মিনালটি চালু করা হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
প্রকল্প পরিচালক ও সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন বলেন, মূল ভবনের কাজ প্রায় শেষ। বর্তমানে ভবনের শেষ পর্যায়ের কাজ, বাগান ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। চলতি মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করার আশা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুলগাঁও বাস-ট্রাক টার্মিনাল চালু হলে উত্তর চট্টগ্রাম এবং দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সঙ্গে যোগাযোগকারী যানবাহনের জন্য একটি নির্ধারিত কেন্দ্র তৈরি হবে। এতে নগরের প্রবেশমুখ অক্সিজেন এলাকার দীর্ঘদিনের যানজটও অনেকাংশে কমতে পারে।
চট্টগ্রাম জেলার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিমুখী বাস-ট্রাকের জন্য এতদিন কোনো নির্দিষ্ট টার্মিনাল ছিল না। ফলে এসব রুটের যানবাহন সড়কের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করত। এতে যানজটের পাশাপাশি নগরীর অন্যান্য রুটের যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হতো।
রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি বাস মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়কের অক্সিজেন হয়ে প্রতিদিন রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি ছাড়াও উত্তর জেলার বিভিন্ন রুটে ৫০০ থেকে ৬০০ বাস চলাচল করে। চট্টগ্রাম-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির নেতারাও জানিয়েছেন, উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন নিয়মিত পাঁচ শতাধিক বাস চলাচল করলেও এতদিন স্থায়ী টার্মিনাল ছিল না। মুরাদপুর কিংবা অক্সিজেন এলাকায় সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠাতে হতো।
তাঁদের মতে, নতুন টার্মিনাল চালু হলে উত্তরাঞ্চলগামী বাসগুলোর চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে। একই সঙ্গে অক্সিজেনসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি এলাকায় যানজট ও জনদুর্ভোগও কমে আসবে। তবে টার্মিনালটির সুফল নিশ্চিত করতে নির্ধারিত রুটের সব বাসকে নিয়ম মেনে টার্মিনাল ব্যবহার করানো এবং সড়কের পাশে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করাও জরুরি।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৯/৯/২০২৬