শিল্প খাতে গ্যাসের সংকট মোকাবিলা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সদস্য সুলতানা আহমেদের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে গ্যাস ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের প্রশ্নের জবাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগের উন্নয়ন পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন, ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করা হবে। এ ছাড়া সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ স্থলভাগ মডেল পিএসসি-২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
নতুন এলএনজি টার্মিনাল: প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস সংকটে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরো একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে আকস্মিক গ্যাস সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত সরবরাহ সক্ষমতা তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।
ভোলার গ্যাসে শিল্প ও বিদ্যুৎ: ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস দেশের মূল গ্যাস নেটওয়ার্কে নিতে চাইলে অন্তত সাত বছর সময় লাগবে। তাই ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
ভোলায় গ্যাসনির্ভর কিছু শিল্প স্থাপনের চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এতে ওই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতির আকার বাড়বে। দেশের মানুষের স্বার্থে ভোলার গ্যাস যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য সেখানে একটি সার কারখানা এবং ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। গ্যাসপ্রাপ্তি সাপেক্ষে অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম বৈদ্যুতিক ট্রেন: অন্যদিকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পথে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। অর্থায়ন পাওয়া সাপেক্ষে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে ট্রেনের গড় গতি বাড়বে এবং যাতায়াতের সময় কমবে।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলপথকে দ্বৈত গেজের দুই লাইনে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। এর অংশ হিসেবে টঙ্গী-আখাউড়া এবং লাকসাম-চট্টগ্রাম পর্যন্ত দ্বৈত গেজের দুই লাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। লাকসাম-চট্টগ্রাম দ্বৈত গেজের দুই লাইন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। টঙ্গী-আখাউড়া প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়নও শেষ পর্যায়ে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা ও ট্রেনের গতি বাড়বে।
ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইন: ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরের দূরত্ব কমাতে ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত কর্ডলাইন নির্মাণের উদ্দেশ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা–চট্টগ্রামের দূরত্ব কমার পাশাপাশি ট্রেনের গড় গতি বাড়বে এবং কম সময়ে যাতায়াত সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা মোকাবিলা এবং শিল্প ও রপ্তানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করাই সরকারের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান, উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বুধবার বিকেল সাড়ে তিনটায় সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী প্রথম আধা ঘণ্টা ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব। এদিন প্রধানমন্ত্রীর জন্য আটটি তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন নির্ধারিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী তিনটি প্রশ্ন ও সাতটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন।
সানা/আপ্র/৯/৯/২০২৬