বৃষ্টির পর চট্টগ্রামে বেড়েই চলেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম সাত দিনেই জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা পাঁচ শতাধিক ছাড়িয়েছে। আগস্টে পুরো মাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক হাজার ২০২ জন। এর আগে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮৩৪ জন। সংক্রমণ বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এখনই সমন্বিতভাবে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরো জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে চট্টগ্রাম নগরের ৭ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডে বিশেষ ক্রাশ কর্মসূচি পরিচালনা করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুই ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় এ কর্মসূচি চালানো হয়। কর্মসূচির আওতায় মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করা হয়। নালা-নর্দমা, ডোবা, জলাবদ্ধ স্থান, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও পরিত্যক্ত জায়গায় জমে থাকা পানিতে লার্ভিসাইড প্রয়োগের পাশাপাশি মশক নিধনের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
কর্মসূচি চলাকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের এডিস মশার প্রজননস্থল সম্পর্কে সচেতন করা হয়। বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম, চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়াউর রহমান জিয়া, মশক ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহি, পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবু তাহেরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, নগরে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের বিস্তার রোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বিশেষ ক্রাশ কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। শুধু ওষুধ প্রয়োগের ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং নাগরিকদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মতে, মশক নিধন কার্যক্রম সফল করতে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। বাসাবাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবেই ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৫৪৮ জন। মারা গেছেন ছয়জন। এর মধ্যে চলতি জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেই মারা গেছেন পাঁচজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামে বর্তমানে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিভিন্ন স্থানে স্বচ্ছ পানি জমে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফুলের টব, ডাবের খোসা, গাড়ির পুরোনো টায়ারসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত পাত্র ও সামগ্রীতে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপেও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম নগরের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডে চালানো জরিপে প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় লার্ভার উপস্থিতি স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, প্রায় প্রতিদিনই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় শরীরে তরলের ভারসাম্য ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনএস-১ পরীক্ষার ফল পজিটিভ হলেই সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন নেই। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ডেঙ্গুর জটিল পর্যায়ে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরের সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে রোগীর শারীরিক অবস্থায় কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রক্তে অণুচক্রিকা কমে গেলেই আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
চট্টগ্রামে আগের বছরগুলোর পরিসংখ্যানও ডেঙ্গুর ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে। ২০২৫ সালে জেলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন চার হাজার ৮৬৪ জন, মারা যান ২৭ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন চার হাজার ৩২৩ জন, মৃত্যু হয় ৪৫ জনের। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৮৭ জন, মারা যান ১০৭ জন। ২০২২ সালে আক্রান্ত হন পাঁচ হাজার ৪৪৫ জন এবং মারা যান ৪১ জন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত মশক নিধন কর্মসূচির পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নজরদারি ও জনসচেতনতা কার্যক্রম আরো জোরদার করাকেই সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৯/৯/২০২৬