মাহমুদ আহমদ=======
সম্প্রতি নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে হাজারের উপরে দাঁড়িয়েছে। চীন-নেপাল সীমান্তের কাছে হিমালয়ের ৫ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় শুরু হয় এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। শনাক্ত হয় ভূকম্পন। পাহাড় থেকে নেমে আসে বরফ। সঙ্গে পাথর, কাদা ও বিপুল পরিমাণ পানি। এই আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও পাহাড়ি ঢলে নেপালের হাজার হাজার মানুষ আজ চরম সংকটে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ছবির মত সাজানো শহরগুলো নিমিষেই তছনছ হয়ে বিরান ভূমিতে পরিণত হচ্ছে। এসব নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা। এর মাধ্যমে তিনি বান্দাদের সতর্ক ও সাবধান করেন; যেন তারা তওবা করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং নিজেদের সংশোধন করে নেয়। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ এবং এ থেকে রক্ষা পাওয়ার বিষয়ে ইসলামের শিক্ষা কী তা নিয়ে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
আমাদের দেশেও প্রায় প্রতি বছরই কম-বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনও এমনভাবে ধেয়ে আসে যার ফলে গ্রামের পর গ্রাম শেষ হয়ে যায়। ভূমিকম্প, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এসবে মানুষের কোনো হাত নেই। এ ধরনের দুর্যোগ মহান সৃষ্টিকর্তা যে কোনো দেশে এবং যে কোনো শহরে যে কোনো মুহূর্তে ঘটাতে পারেন।
এমন এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধ্বংসলীলার দৃশ্য গত সপ্তাহে আমরা নেপালে প্রত্যক্ষ করেছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সেখানে লাশের মিছিল।
এখন পর্যন্ত নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঠিক কারণ উদঘাটন করতে পারেনি। শুরুতে ভূমিকম্পের কারণে এই বন্যা হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহ ধস এবং এর ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতই মূলত সেই ভূ-কম্পন তৈরি করেছিল। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে পুরো ঘটনার পর্যায়ক্রম অনুসন্ধানে কাজ করছেন। হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বরফ গলার গতি বাড়লেও এই আকস্মিক দুর্যোগের পেছনে এর সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে তারা মনে করছেন।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পৃথিবীতে কেন আজাব-গজব পাঠান সে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে। একটা বিষয় সবার বোঝা উচিত, কেন বারবার আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে আজাবের কথা উল্লেখ করলেন? তিনি যেহেতু রহমানুর রাহিম, তিনি চান না যে, তার বান্দা কোনোভাবে কষ্টে নিপতিত হোক। তাই তিনি বারবার সতর্ক করেছেন, যেন তার বান্দারা সঠিক পথে পরিচালিত হয়।
তাই আমরা কেউ বলতে পারি না কোন সময় নেপালের মতো এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকারে পরিণত হবে আমাদের দেশ বা অন্য কোনো দেশ। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। তাই এসব প্রাকৃতিক আজাব থেকে সৃষ্টিকর্তা যেন আমাদের নিরাপদ রাখেন এটাই আমাদের প্রার্থনা।
আজ পৃথিবীতে যখন ভূমিকম্প, বন্যা, ঝড়ুতুফান দেখা দেয়, তখন আমাদেরও হজরত ওমরের মতো বলতে হয়- আমাদের কী পরিবর্তন হয়েছে? আমরা কোথায় ভুল করেছি? কীভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যাব? এ সব প্রাকৃতিক বিপর্যয় শুধু ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং মানুষের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা ইমানকে জাগানোর জন্যই আসে।
এক হাদিসে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে, কাউকে বিশ্বাস করে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হবে কিন্তু তার খেয়ানত করা হবে, জাকাতকে দেখা হবে জরিমানা হিসেবে, ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া বিদ্যা অর্জন করা হবে, পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে কিন্তু মায়ের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করবে, বন্ধুকে কাছে টেনে নিয়ে পিতাকে দূরে সরিয়ে দেবে, মসজিদে উচ্চৈঃস্বরে শোরগোল হবে, জাতির সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিটি সমাজের শাসকরূপে আবির্ভূত হবে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি হবে নেতা, একজন মানুষ যে খারাপ কাজ করে খ্যাতি অর্জন করবে, তাকে তার খারাপ কাজের ভয়ে সম্মান প্রদর্শন করা হবে, বাদ্যযন্ত্র এবং নারী শিল্পীর ব্যাপক প্রচলন হবে, মদ পান করা হবে, লোকজন তাদের পূর্ববর্তী মানুষগুলোকে অভিশাপ দেবে, এমন সময় তীব্র বাতাস প্রবাহিত হবে এবং এমন একটি ভূমিকম্প হবে যা সেই ভূমিকে তলিয়ে দেবে। (তিরমিজি)
প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে সতর্ক সংকেত। আল্লাহপাক সতর্ক করছেন যে, তোমরা সহজ-সরল পথ অবলম্বন কর। সমাজ ও দেশের বেশিরভাগ মানুষ যখন পাপ, ব্যভিচার, অন্যায় এবং আল্লাহকে ভুলে বসে তখনই তিনি তার পক্ষ থেকে সতর্ক বার্তা দেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘আর তোমাদের কৃতকর্মের কারণই তোমাদের ওপর বিপদ নেমে আসে। অথচ তিনি অনেক কিছুই উপেক্ষা করে থাকেন।’ (সুরা আশশুরা, আয়াত : ৩০)
আল্লাহতায়ালা আরো ইরশাদ করেছেন, ‘এমন কোনো জনপদ নেই যা আমরা কেয়ামতের আগে ধ্বংস না করব, অথবা অতি কঠোর আজাব দিব।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৫৮)
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের হুঁশিয়ারি আজ আমরা অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হতে দেখছি। যে-সব আজাব আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা কেয়ামত তথা মহাধ্বংসের লক্ষণ হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। আর এসব পবিত্র কুরআন তথা ইসলামের সত্যতার জ্বলন্ত নিদর্শন বহন করছে।
আল্লাহতায়ালা পরম করুণাময়, তিনি কোনো জাতিকে সাবধান না করে কখনও আজাব অবতীর্ণ করেন না। যেভাবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘আমরা সতর্ক করার জন্য রসুল প্রেরণ না করে কখনও আজাব অবতীর্ণ করি না।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১৫) ‘নূহের পর আমরা কত প্রজন্মকেই ধ্বংস করেছি। আর তোমার প্রভু প্রতিপালক তার বান্দাদের পাপের খবরাখবর রাখার ক্ষেত্রে এবং পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে যথেষ্ট।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১৭)
পৃথিবীর এমন কোনো দেশ বা এমন কোনো জাতি নেই যার ওপর আজাব না এসেছে, সে যত বড়ো শক্তিধর রাষ্ট্রই হোক না কেন। সব ধরনের আজাবের প্রবল আক্রমণ মানুষের ওপর বারবার আঘাত হানছে। মানব প্রকৃতি বিকৃত হয়েছে। তার কারণে আল্লাহর রুদ্ররূপও মাঝে মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে।
আল্লাহতায়ালা যেভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো সতর্ককারী প্রেরণ না করে তিনি আজাব দেন না। যেভাবে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে ‘তুমি বল, আল্লাহর হাত থেকে কে তোমাদের রক্ষা করতে পারে যদি তিনি তোমাদের কোনো শান্তি দিতে চান? অথবা তিনি যদি তোমাদের প্রতি কৃপা করতে চান তবে কে এ থেকে তোমাদের বঞ্চিত করতে পারে? আর তারা নিজেদের জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবক বা কোনো সাহায্যকারীও খুঁজে পাবে না।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ১৭)
এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মূলত কেয়ামতের পূর্বাভাস। বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেয়ামতের যে কয়টি লক্ষণ বাতলে গেছেন, তার মধ্যে একটি হলো, কেয়ামতের আগে ভূমিকম্প বেড়ে যাবে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুল করিম (সা.) বলেছেন, কেয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত হবে না, যে পর্যন্ত না ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে, খুনখারাবি বৃদ্ধি পাবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে তা উপচে পড়বে।’ (বুখারি)
এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে দুনিয়ার অস্থায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এবং নিজের জীবন সংশোধনের একটি সুযোগ। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে ও স্থলে বিপর্যয় দেখা দেয়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কিছু কিছু কৃতকর্মের ফল প্রদান করে থাকেন, যেন তারা পাপ থেকে ফিরে আসে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)।
এক হাদিসে এসেছে, অশ্লীলতা, মাদকদ্রব্য গ্রহণ ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপকতাই এর মূল কারণ। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এ উম্মত ভূমিকম্প, বিকৃতি এবং পাথরবর্ষণের মুখোমুখি হবে। একজন সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন, কখন সেটা হবে হে আল্লাহ রাসুল? তিনি বলেন, যখন গায়িকা এবং বাদ্যযন্ত্রের প্রকাশ ঘটবে এবং মদপানের সয়লাব হবে। (তিরমিজি)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পৃথিবীতে কেন আজাব-গজব পাঠান সে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে। একটা বিষয় সবার বোঝা উচিত, কেন বারবার আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে আজাবের কথা উল্লেখ করলেন? তিনি যেহেতু রহমানুর রাহিম, তিনি চান না যে, তার বান্দা কোনোভাবে কষ্টে নিপতিত হোক। তাই তিনি বারবার সতর্ক করেছেন, যেন তার বান্দারা সঠিক পথে পরিচালিত হয়।
নেপালে ঘটে যাওয়া এমন ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেও যদি আমাদের হুঁশ না হয় তাহলে আর কবে আমাদের হুঁশ হবে? তাই সময় থাকতেই আমাদের দোষ-ত্রুটির জন্য পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে এবং সৎ পথে জীবন পরিচালনা করার অঙ্গীকার করতে হবে।
কেননা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের অহংকার ভেঙে দিয়ে মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই আমাদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহপাকের দরবারে সবিনয় ক্ষমা চেয়ে ইস্তেগফারে রত হই।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে সব ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।
সানা/আপ্র/৫/৯/২০২৬