সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচয় না দিয়ে দেশের সমান অধিকারভুক্ত নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় পরিচয়ের আগে সবার নাগরিক পরিচয়ই প্রধান। রাষ্ট্র সবার এবং নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারও সবার।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে ‘কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী উৎসব-১৪৩৩’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পরে পলাশী মোড় থেকে শুরু হওয়া জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনারা বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে কেউই সংখ্যালঘু হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেবেন না—এটা আমরা আশা করি। আপনারা সবাই পরিচয় দেবেন নাগরিকত্বের ভিত্তিতে, ধর্মের ভিত্তিতে দেবেন না। সবাই বলবেন, এ দেশের সমান অধিকারভুক্ত একজন নাগরিক হিসেবে।’
তিনি বলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার এবং নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।’
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি নির্দিষ্ট দলের ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করার পুরোনো রাজনৈতিক ধারণার সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতীতে যারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চেয়েছিল এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি নির্দিষ্ট দলের ভোটব্যাংক মনে করেছিল, দেশের সচেতন জনগণ সেই ভ্রান্ত ধারণা ও কৃত্রিম মিথ ভেঙে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘জনগণই বিচারক, আপনারা ইতোমধ্যে রায় দিয়েছেন এবং আগামীতেও গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় রাখতে এবং সব ধরনের অসুর শক্তি ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে আপনাদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা থাকবে।’
সবার আগে বাংলাদেশ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের নেতা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—সবার আগে বাংলাদেশ। আর যদি সবার আগে বাংলাদেশ হয়, তবে আমরা প্রত্যেকেই সবার আগে বাংলাদেশি। আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় এর পরে আসবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের মূল নীতিই হলো সবার জন্য বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের সব নাগরিক—মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা নৃগোষ্ঠীর মানুষ—নিজ নিজ ধর্মাচার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি স্বাধীনভাবে পালন করবেন। তবে জাতীয় পরিচয়ে সবাই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার ভোগ করবেন। সংবিধানে সব ধর্মের ধর্মচর্চা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়গুলোও নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু সেটা কিতাবে, সংবিধানে ধারণ করেই বসে থাকতে চাই না। বাস্তবে আমরা এই সম্প্রীতি, এই স্বাধীনতা নিশ্চিত করব এবং আমরা সেই ঘোষণা দিয়েছি।’
‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ নয়, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি: ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ শব্দটির ব্যবহার নিয়েও নিজের মত তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা সচরাচর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শব্দটি ব্যবহার করি। কিন্তু আমি মনে করি, সাম্প্রদায়িক শব্দটির আর প্রয়োজন নেই।’ তিনি বলেন, ‘আজ থেকে আমাদের বলতে হবে—আমরা ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং শান্তি বজায় রাখব। এই ইতিবাচক চর্চাই সমাজকে আরও সুন্দর করবে।’
অনুষ্ঠানে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম। আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর ও সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শোভাযাত্রার উদ্বোধন ঘোষণা করে বলেন, ‘মঙ্গল হোক সবার।’
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬