ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও নানা বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দেশজুড়ে পালিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি শুভ জন্মাষ্টমী। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ প্রার্থনা, গীতাযজ্ঞ, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ, কীর্তন, আরতি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাজধানীতে দিনের প্রধান আয়োজন ছিল ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরকেন্দ্রিক ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী শোভাযাত্রা। সকাল ৮টায় দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় গীতাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শংকর মঠ ও মিশন এ গীতাযজ্ঞ পরিচালনা করে।
বিকেলে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী শোভাযাত্রা। পলাশী বাজার, জগন্নাথ হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট, বঙ্গবাজার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবন, গোলাপশাহ মাজার, গুলিস্তান, নবাবপুর রোড ও রায় সাহেব বাজার হয়ে শোভাযাত্রাটি বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হয়।
শোভাযাত্রার উদ্বোধন উপলক্ষে পলাশীর মোড়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ধর্ম বা অন্য কোনো বিভাজনের ভিত্তিতে নয়, নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তিতেই দেশের প্রতিটি মানুষ সমান অধিকার ও নিরাপত্তা ভোগ করবে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সবার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত ‘আমরা সবাই বাংলাদেশি’। ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় এর পরে আসবে। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ধর্মের ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্য না করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম, ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদারসহ অনেকে।
শোভাযাত্রায় শ্রীকৃষ্ণের রথ, রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি, কংসের কারাগার, রাম-সীতা, লব-কুশসহ শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও পুরাণের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের উপজেলা থেকে ভক্তরা ট্রাক, পিকআপ, ঘোড়ার গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনে করে শোভাযাত্রায় যোগ দেন।
ঢাকা কলেজেও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা: শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ঢাকা কলেজেও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার বিকেল ৩টায় কলেজের পশ্চিম ছাত্রাবাসের সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গিয়ে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়।
শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন পশ্চিম ছাত্রাবাসের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক কামরুজ্জামান। তিনি শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান। আবাসিক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত শোভাযাত্রায় ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
চট্টগ্রামে মহাশোভাযাত্রা: চট্টগ্রাম নগরীতেও বর্ণাঢ্য মহাশোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে শুক্রবার সকালে আন্দরকিল্লা মোড় থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে লালদীঘির পাড়, কোতোয়ালি মোড়, নিউমার্কেট, নন্দনকানন, ডিসি হিল ও চেরাগী পাহাড় মোড় হয়ে জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন বাঁশখালী ঋষিধাম ও তুলসীধামের মহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ স্বামী সচ্চিদানন্দ পুরী মহারাজ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, পৃথিবীর সব ধর্মের মূল লক্ষ্য মানুষের অধিকার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। ধর্মের ভিত্তিতে নয়, জ্ঞান, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মানুষকে মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি।
শোভাযাত্রায় হাজারো মানুষ অংশ নেন। ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও চরিত্রের আদলে সেজে এতে যোগ দেন। বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারে সমঅধিকার, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের দাবিও তুলে ধরা হয়।
কুমিল্লা-নীলফামারীসহ বিভিন্ন স্থানে আয়োজন: কুমিল্লায় জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের দেশ। সব ধর্মের মানুষ দেশের সমান অংশীদার এবং দেশকে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার দায়িত্ব সবার। আলোচনা সভা শেষে সেখানে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
নীলফামারীতে জেলা শহরের কেন্দ্রীয় শ্রীশ্রী কালিমাতা মন্দির চত্বর থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের মহানাম কীর্তন ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের হাটহাজারী, চন্দনাইশ, রাঙামাটির কাপ্তাই, খাগড়াছড়ি, সিলেটের জৈন্তাপুর, বগুড়া, বরিশালের গৌরনদী, মাদারীপুর, রংপুর, তারাগঞ্জ, নেত্রকোনার দুর্গাপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শোভাযাত্রা, পূজা, কীর্তন, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জন্মাষ্টমী উদযাপিত হয়েছে।
এদিকে, জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ তিন দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে। স্বামীবাগ আশ্রমে শুক্রবার শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ, কীর্তনমেলা, আলোচনা সভা, সন্ধ্যা আরতি, শ্রীকৃষ্ণলীলামৃত পাঠ ও মহাভিষেকের আয়োজন করা হয়। রাজধানীর রমনা কালীমন্দির, রাজারবাগের বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দির ও ধর্মীয় সংগঠনও দিনটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করে।
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মথুরার কারাগারে দেবকী ও বসুদেবের ঘরে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য, ন্যায় ও সুন্দর প্রতিষ্ঠার জন্যই তাঁর আবির্ভাব। সেই বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ধারণ করে প্রতিবছর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবের মধ্য দিয়ে জন্মাষ্টমী পালিত হয়।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলেও বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়।
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬