শোয়েব সাম্য সিদ্দিক====
একটা ঋণের ফাইল অনুমোদনের আগে কতগুলো ধাপ পার হয়, সাধারণ পাঠক সেটা জানেন না। শাখা পর্যায়ে যাচাই, প্রধান কার্যালয়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন, তারপর অনুমোদন কমিটির সিদ্ধান্ত। বন্ধ কারখানার জন্য যখন নতুন করে ৪১ হাজার কোটি টাকা বিতরণের কথা আসে, তখন এই ধাপগুলো কতটা দ্রুত আর কতটা যথাযথভাবে পার হবে, সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঋণ বিতরণ করা সহজ, কিন্তু সেই অর্থে উৎপাদন শুরু করে ঋণ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা কঠিন। তহবিলটির সাফল্য শেষ পর্যন্ত সেখানেই নির্ভর করবে।
একসময় দুই হাজারের বেশি কারখানা ছিল, এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে আটশোর ঘরে। এই পতন শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমার ঘটনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের নানা সংকট ও অনিশ্চয়তা। একটা কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে সাধারণত একটা কারণ থাকে না, একসঙ্গে কয়েকটা কারণ জমা হতে হতে একদিন তালা পড়ে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, ক্রেতার কার্যাদেশ বাতিল হওয়া, ব্যাংকের পুরোনো ঋণ শোধ করতে না পারা, এই সবকিছু একসঙ্গে চলে। ফলে নতুন ঋণ পেলেই কারখানাটি টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসছে সতেরোটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে, বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে। এই সতেরোটি ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংক একাই কুড়ি হাজার কোটি টাকা জোগানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা এই তহবিলের সবচেয়ে বড় একক অবদান। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে সোনালীর শাখা নেটওয়ার্ক আর মূলধন সক্ষমতা তুলনামূলক বড়, তাই এই দায়িত্ব নেওয়াটা স্বাভাবিক একটা জায়গা থেকেই এসেছে বলা যায়। তবে ব্যাংকিং খাতের মানুষ হিসেবে আমার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, তা হলো এত বড় অঙ্কের দায়িত্ব সামলাতে হলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সক্ষমতাও সেই অনুপাতে বাড়ানো দরকার।
এখন দেখতে হবে, কোন কারখানার আবার উৎপাদনে ফেরার বাস্তব সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে একটি-দুটি তথ্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শাখা পর্যায়ের ঋণ কর্মকর্তারা সাধারণত কারখানার সাম্প্রতিক ব্যাংক লেনদেন, ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের ধারাবাহিকতা আর যন্ত্রপাতির প্রকৃত অবস্থা দেখে ধারণা করেন। কিন্তু একটা কারখানা যদি এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকে, তাহলে এই তিনটা সূচকই দুর্বল হয়ে যায়। ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, শ্রমিক অন্য কারখানায় চলে যান, যন্ত্রপাতির স্বাভাবিক ক্ষয় বাড়ে। তাই দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানার ফাইল আর নতুন বন্ধ হওয়া কারখানার ফাইলকে একই মানদণ্ডে বিচার করলে ভুল হবে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ও সদ্য বন্ধ হওয়া কারখানার ঝুঁকি এক নয়। তাই ঋণ যাচাইয়েও এ পার্থক্যটি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এরপরেই যে প্রশ্নটি সামনে আসবে, পুরোনো ঋণের কী হবে? এই তহবিলের আলোচনায় এই অংশটা সবচেয়ে কম আসে, অথচ এটাই আসল জটিলতার জায়গা। যেসব কারখানা এর মধ্যেই খেলাপি ঋণের তালিকায় আছে, তাদের নতুন ঋণ দেওয়ার আগে পুরোনো দায় কীভাবে পুনর্গঠন হবে, সেই কাঠামো স্পষ্ট না হলে নতুন টাকাও পুরোনো হিসাবের মধ্যেই আটকে যাবে। একটা কারখানা যদি আগের ঋণের সুদই শোধ করতে না পারে, তাহলে নতুন করে যন্ত্রপাতি সচল করার টাকা কীভাবে সে ফেরত দেবে? পুরোনো ঋণের সমাধান না করে শুধু সুদ কমালে নতুন অর্থেরও বড় অংশ আগের দায় মেটাতেই চলে যেতে পারে। এখানে একটা বাস্তব পথ হতে পারে পুরোনো দায়ের একটা অংশ পুনঃতফসিলিকরণ করে নতুন ঋণের সঙ্গে যুক্ত করা, যাতে কারখানার মাসিক পরিশোধের বোঝা একসঙ্গে দুই দিক থেকে না আসে। পুরোনো দায়ের সঙ্গে নতুন ঋণের হিসাব না মেলালে এই অর্থায়ন থেকে স্থায়ী ফল পাওয়া কঠিন হবে।
গ্যাস আর বিদ্যুতের প্রশ্নটাও এখানে সরাসরি ঋণ ঝুঁকির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। একটা কারখানা নতুন ঋণ নিয়ে যন্ত্রপাতি চালু করলেও যদি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না পায়, তাহলে উৎপাদন শুরু হবে না, নগদ প্রবাহও তৈরি হবে না। নগদ প্রবাহ ছাড়া ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও থাকে না। এভাবে আজকের নতুন ঋণ কয়েক মাসের মধ্যে আবার খেলাপি ঋণের তালিকায় যোগ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। জ্বালানি সরবরাহের একটা স্পষ্ট সময়সূচি প্রকাশ না হলে এই ঝুঁকি এড়ানো কঠিন। ব্যাংকের হিসাবেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারখানা যদি নিয়মিত উৎপাদনই করতে না পারে, তাহলে ঋণ পরিশোধের টাকা আসবে কোথা থেকে? এটা না থাকলে যতই কাগজে জামানত রাখা হোক, ঋণের প্রকৃত নিরাপত্তা তৈরি হয় না।
এই তহবিলের আসল পরীক্ষা হবে বিতরণের প্রথম ছয় মাসে। কারণ শুরুতে যদি যাচাই শিথিল হয়ে যায়, সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ বিতরণ হয়, তাহলে বাকি সময়টাও একই পথে চলবে। উল্টোদিকে শুরুতে যদি যাচাই খুব কঠোর হয়ে যায়, তাহলে প্রকৃত সম্ভাবনাময় কারখানাগুলোও ভয়ে আবেদন করা থেকে পিছিয়ে যেতে পারে। এই দুইয়ের মাঝে একটা ভারসাম্য খুঁজে বের করাই এখন অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় কাজ। এই ভারসাম্য ধরে রাখতে নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা ও অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে বোঝা যাবে, অর্থ পাওয়া কারখানাগুলোর কতগুলো বাস্তবে উৎপাদনে ফিরেছে। এই ধরনের নিয়মিত প্রতিবেদন ছাড়া মাঝপথে সংশোধনের সুযোগ থাকবে না।
স্থানীয় উদাহরণ থেকে একটা কথা বলা যায়। আদমজী ইপিজেডে একটা প্রতিষ্ঠান লিড গোল্ড সনদ ধরে রেখে বছরে প্রায় আটানব্বই মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়নি, কারণ তারা ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক আর সনদ দুটোই ধরে রেখেছিল। অর্থাৎ কারখানা চালু রাখার জন্য শুধু যন্ত্রপাতি ও অর্থ থাকলেই হয় না, বাজার এবং ক্রেতার আস্থাও ধরে রাখতে হয়। যে কারখানা এই যোগাযোগ হারিয়েছে, তার জন্য শুধু টাকা যথেষ্ট নয়। তাকে নতুন করে ক্রেতা খুঁজতে হবে, নতুন করে সনদ নবায়ন করতে হবে, নতুন করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হবে। এই প্রক্রিয়াটা কোনো ঋণের কিস্তির সঙ্গে মিলিয়ে চলে না, এর নিজস্ব একটা সময়রেখা আছে।
বাইরের প্রতিযোগিতার চাপও কম নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সাম্প্রতিক সময়ে চাপে পড়েছে, আর ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারতসহ কয়েকটি দেশ দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। সময় যত গড়াবে, বাজারের হারানো অংশ ফিরে পাওয়া তত কঠিন হবে। তাই এই তহবিল বিতরণের গতিও একটা প্রতিযোগিতামূলক বিষয়। ধীরে চললে টাকা হয়তো নিরাপদ থাকবে, কিন্তু বাজারের জায়গা হাতছাড়া হবে। দ্রুত চললে বাজারের জায়গা ধরে রাখা যাবে, কিন্তু ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যাবে। তাই ব্যাংকগুলোকে একদিকে দ্রুত ঋণ দিতে হবে, অন্যদিকে ঝুঁকির জায়গাগুলোও এড়িয়ে চলতে হবে।
শেষ কথা হলো, এই তহবিল ঘোষণা একটা সাহসী পদক্ষেপ, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর, ঝুঁকি যাচাইয়ের মান কতটা ধরে রাখা যায়, পুরোনো ঋণের পুনর্গঠন কতটা বাস্তবসম্মতভাবে হয়, আর জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা কতটা সময়মতো আসে। তিনটির কোনো একটি ঠিকমতো কাজ না করলে পুরো উদ্যোগের ফলই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ৬০ হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কতগুলো কারখানা টেকসইভাবে উৎপাদনে ফিরতে পারল, তার ওপর।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
সানা/আপ্র/২/৯/২০২৬