বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। ‘ফিরছে নতুন রূপে বিটিভি’ স্লোগানে নতুন লোগোর জন্য আইডিয়া ও নকশা আহ্বান করেছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটি। তবে উদ্যোগটি সামনে আসার পর পুরোনো লোগোর সঙ্গে শৈশবের স্মৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িয়ে থাকার কথা তুলে ধরে এর পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন অনেক দর্শক।
গত ৩০ আগস্ট বিটিভির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে নতুন লোগো তৈরির প্রচারণামূলক ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এতে সাধারণ মানুষ ও নকশাবিদদের কাছ থেকে নতুন লোগোর ধারণা বা নকশা আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নকশা পাঠাতে বলা হয়েছে বিটিভির নির্ধারিত ই-মেইল ঠিকানায়।
বিটিভির এই উদ্যোগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। দর্শকদের একটি বড় অংশ বর্তমান লোগো পরিবর্তনের বিপক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, লোগোটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয়চিহ্ন নয়; এর সঙ্গে কয়েক প্রজন্মের দর্শকের শৈশব, স্মৃতি ও আবেগ জড়িয়ে আছে।
অনেকেই আবার লোগো পুরোপুরি পরিবর্তন না করে সেটিকে আধুনিক করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, ঐতিহ্যবাহী নকশার মূল বৈশিষ্ট্য ধরে রেখে আধুনিক উপস্থাপনা করা যেতে পারে।
লোগোর সঙ্গে জড়িয়ে ইতিহাস
বিটিভির বর্তমান লোগোর সঙ্গেও দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। সবুজ বেষ্টনীর মধ্যে উদীয়মান লাল সূর্যের প্রতীকসমৃদ্ধ এই লোগোর নকশার সঙ্গে শিল্পী ইমদাদ হোসেন, কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার ও মহিউদ্দিন ফারুকের সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে।
১৯৮০ সালে বিটিভি রঙিন সম্প্রচারে যাওয়ার সময় লোগোটির রঙিন রূপ ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া যায়। ফলে নতুন লোগোর উদ্যোগকে ঘিরে আলোচনা শুধু নকশা পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ নেই। বিটিভিকে আধুনিক ও নতুন প্রজন্মের উপযোগী করার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের পরিচিতি, ইতিহাস ও দর্শকের আবেগ কীভাবে সমন্বয় করা হবে—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
‘ঐতিহাসিক লোগো টিকিয়ে রেখে পরিবর্তন’
বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খ ম হারূনও লোগো পরিবর্তন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত দিয়েছেন। তিনি ঐতিহাসিক লোগোটি টিকিয়ে রেখে সেটিকে আরো আকর্ষণীয় করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
তিনি বলেন, বিটিভির স্বর্ণালি সময়ের সঙ্গে লোগোটির একটি আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। বরেণ্য শিল্পীদের অবদান বিবেচনায় নিয়ে ঐতিহাসিক লোগো সংরক্ষণ করা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আধুনিকায়নের অংশ লোগো পরিবর্তন
লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগকে বিটিভির সামগ্রিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেখছেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক কাজী জেসিন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, অর্গানোগ্রাম, শিল্পী সম্মানী, সংবাদ পরিবেশনাসহ বিটিভির সর্বস্তরে আধুনিকায়নের চেষ্টা চলছে। সেই আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলোর একটি অংশ হলো লোগো পরিবর্তন।
তবে পুরোনো লোগোর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, বরেণ্য শিল্পীদের অবদান সংরক্ষণ করেই পরিবর্তন আনা হবে। দর্শকরা না চাইলে লোগো পরিবর্তন করা হবে না। যেকোনো পরিবর্তন শিল্পী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে করার কথাও জানান তিনি।
এর আগে ২৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিন। সাক্ষাতের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, বিটিভিকে একটি বিশ্বাসযোগ্য, আধুনিক ও জনআস্থার চ্যানেল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে বিটিভির লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগে একদিকে আধুনিকায়নের প্রত্যাশা, অন্যদিকে ঐতিহ্য ও আবেগ ধরে রাখার দাবি—দুই ধরনের মতই সামনে এসেছে। শেষ পর্যন্ত নতুন লোগো কেমন হবে এবং বর্তমান লোগোর কতটা অংশ তাতে থাকবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এসি/আপ্র/০২/০৯/২০২৬