রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব কী? নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ আজ সেই মৌলিক নিরাপত্তাই যেন ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছে। রাজধানীর রাজপথ থেকে জেলা-উপজেলার নির্জন সড়ক—কোথাও মানুষ পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছে না। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, খুন ও সশস্ত্র হামলার একের পর এক ঘটনা জনমনে যে আতঙ্ক তৈরি করছে, তা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য ভয়ংকর সতর্কসংকেত।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীদের টানে চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে এক শিক্ষিকার মৃত্যু সেই সতর্কসংকেতকে আরো মর্মান্তিক করে তুলেছে। যে সংসদ ভবন রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা ও জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রতীক, তার সামনেই যদি একজন নাগরিক ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণ হারান, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এর পরপরই রাজধানীর ধানমন্ডিতে ব্যাংক থেকে তোলা ৩৯ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। পিস্তলসহ একজনকে আটক এবং পরে আরো দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই দিনে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয় দিয়ে অস্ত্রের মুখে এক ব্যাংক এজেন্টকে তুলে নিয়ে ১২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। খুলনার ডুমুরিয়ায় ওষুধ কোম্পানির এক বিক্রয় প্রতিনিধিকে ছুরিকাঘাত করে প্রায় ৩ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে হাত-পা বেঁধে ঝোপে ফেলে রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
এগুলো কি কেবল কয়েকটি অপরাধের ঘটনা? নিশ্চয়ই নয়। একই ধরনের অপরাধ যখন বারবার, বিভিন্ন স্থানে এবং প্রায় একই কায়দায় ঘটতে থাকে, তখন তার পেছনে সংগঠিত অপরাধচক্রের অস্তিত্ব, অপরাধীদের বেপরোয়া মানসিকতা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রশ্ন সামনে আসে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অপরাধীরা যেন ক্রমেই রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধের ভয় হারিয়ে ফেলছে।
২০২৪ সালের সরকার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যে অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের সূচনা হয়েছিল, তা পুরোপুরি কাটেনি—এমন ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল। সরকারি ভাষ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বলা হলেও মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। প্রতিদিনের খুন, জখম, সংঘর্ষ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের খবর সেই অস্বস্তিকেই আরো গভীর করছে। রাষ্ট্রের সাফল্য তাই শুধু কতজন গ্রেফতার হলো, কতটি মামলা হলো—এই হিসাব দিয়ে বিচার করা যাবে না; মানুষ কতটা নিরাপদে ঘর থেকে বেরোতে পারছে, ঘরে ফিরতে পারছে-সেটিই আসল মাপকাঠি।
সরকারকে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে দৃশ্যমান টহল ও নজরদারি বাড়াতে হবে। ছিনতাই ও চাঁদাবাজির সংঘবদ্ধ চক্র ভেঙে দিতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করতে হবে। অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ, দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ অভিযোগপত্র এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতর কেউ অপরাধীদের প্রশ্রয় দিলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ পরিচয় বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা জরুরি।
জনগণ ইতিমধ্যে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, মূল্যস্ফীতি ও জীবিকার নানা সংকটে বিপর্যস্ত। একেরপর এক কলকারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে বহু মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। এর সঙ্গে যদি জীবনের নিরাপত্তাহীনতা যুক্ত হয়, তবে জনদুর্ভোগ শুধু বাড়ে না—রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও ক্ষয়ে যায়। একটি বহুল প্রত্যাশিত সরকারের শুরুতেই এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়া তাই নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি সুশাসনের জন্য অশুভ বার্তা।
অতএব সরকারের হাতে সময় সীমিত। এখন প্রয়োজন আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান ফল। এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হলে মানুষ আতঙ্কিত হবে না; ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে ফিরতে ভয় পাবে না; কর্মজীবী মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে পথে নেমে মৃত্যুর ঝুঁকি নেবে না। অপরাধীদের ভয় নয়, রাষ্ট্রের আইনই হবে রাজপথের শেষ কথা। জননিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে তাই এখনই সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। কারণ নিরাপদ নাগরিক ছাড়া উন্নয়ন অর্থহীন, আর নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্রে সুশাসনের দাবি কেবলই শব্দের অলংকার।
সানা/আপ্র/২/৯/২০২৬