গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬

মেনু

প্রেমহীন শিল্প কি মানুষের গল্প বলতে পারে?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:১৩ পিএম, ৩০ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৭:১৬ এএম ২০২৬
প্রেমহীন শিল্প কি মানুষের গল্প বলতে পারে?
ছবি

সংগৃহীত প্রতীকী ছবি

প্রেমকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ প্রেম কোনো আরোপিত সংস্কৃতি নয়, মানুষের প্রকৃতিগত অনুভূতি। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই ভালোবাসা মানুষের অস্তিত্ব, সম্পর্ক ও সৃজনশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি শিশু মায়ের প্রতি যে গভীর টান অনুভব করে, মা-বাবা সন্তানের জন্য যে অকৃত্রিম মমতা ধারণ করেন, মানুষের বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, প্রকৃতি ও সৃষ্টির প্রতি আকর্ষণ-সবই ভালোবাসার বিচিত্র প্রকাশ। মানুষের এই প্রেমময় সত্তাই তাকে বৃহত্তর মানবতা, সৌন্দর্য ও পরমের দিকে টেনে নেয়। ফলে প্রেম ও রোমান্টিকতা মানুষের অনুভূতিজগতের স্বাভাবিক ও স্বীকৃত অনুষঙ্গ। তাকে নাটক-সিনেমা থেকে নির্বাসিত করার দাবি তাই শুধু একটি শিল্পধারাকে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতির বহুমাত্রিক প্রকাশকেও সংকুচিত করার আশঙ্কা তৈরি করে।

সম্প্রতি প্রেম ও রোমান্সনির্ভর নাটক-সিনেমা নির্মাণ ও সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ চেয়ে দেওয়া আইনি নোটিশ এবং এর প্রতিবাদে টেলিভিশন ও বিনোদন অঙ্গনের সাতটি সংগঠনের অবস্থান-এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। নোটিশে যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবন থেকে মনোযোগ বিচ্যুতি, পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে স্বাভাবিকীকরণ এবং সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। এসব উদ্বেগের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। গণমাধ্যম মানুষের রুচি ও মানসগঠনে প্রভাব ফেলে। কিন্তু কোনো একটি শিল্পধারাকেই নৈতিক অবক্ষয় বা অপরাধের জন্য দায়ী করতে হলে প্রয়োজন শক্ত প্রমাণ, গবেষণা ও কারণ-সম্পর্কের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা। আশঙ্কাকে প্রমাণের বিকল্প বানানো নীতিনির্ধারণের সুস্থ পদ্ধতি হতে পারে না।

প্রেমের গল্প মানেই অশালীনতা নয়; রোমান্টিকতা মানেই পরকীয়া বা নৈতিক অবক্ষয়ও নয়। প্রেম কখনো মানবিকতার গল্প, কখনো আত্মত্যাগের, কখনো বিরহের, কখনো সামাজিক বাস্তবতার নির্মোহ প্রতিচ্ছবি। বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য তার সাক্ষ্য বহন করে। অন্যদিকে প্রেমের আড়ালে অশ্লীলতা, সম্পর্কের বিকৃতি, পরকীয়ার মহিমান্বিত উপস্থাপন কিংবা অনৈতিকতাকে অনুকরণীয় করে তোলার প্রবণতা থাকলে তার সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সমাধান পুরো শিল্পধারাকে নিষিদ্ধ করা নয়; বরং বিষয়বস্তুর মান ও উপস্থাপনার দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা।

এখানে একটি স্বাভাবিক প্রশ্নও সামনে আসে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আইনি নোটিশদাতা আইনজীবীর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকাশ্য পাতায় দেশি-বিদেশি রোমান্টিক চলচ্চিত্র, নাটক ও গানের প্রতি আগ্রহের নানা প্রকাশ দেখা গেছে। অতীতে তিনি রোমান্টিক চলচ্চিত্র দেখার কথাও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। ব্যক্তির নিজস্ব শিল্পরুচি থাকা কোনো অপরাধ নয়; বরং সেটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি নিজে যে শিল্প উপভোগ করেছেন বা যার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সেই একই শিল্পধারার নির্মাণ ও সম্প্রচারে ব্যাপক বিধিনিষেধ চাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর যুক্তির সীমারেখাটি কোথায়-প্রশ্নটি তাই একেবারেই অযৌক্তিক নয়। ব্যক্তিগত পছন্দকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়, বরং জনস্বার্থে উত্থাপিত নীতিগত দাবির সঙ্গে ব্যক্তিগত অবস্থানের এই আপাত বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা জানা জরুরি।

রাষ্ট্রের কাজ মানুষের রুচি নির্ধারণ করা নয়; বরং নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে ক্ষতিকর ও আইনবিরোধী উপাদানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করে; একই সঙ্গে শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতার সুযোগও রাখে। সেই সীমা অবশ্যই হতে হবে স্পষ্ট, প্রয়োজনীয়, আনুপাতিক ও আইনসম্মত। কোনো নির্দিষ্ট ঘরানা বন্ধ করে দেওয়া সেই ভারসাম্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই বড় প্রশ্ন।

নির্মাতা ও শিল্পীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। স্বাধীনতা তাঁদের অধিকার, কিন্তু দায়িত্বহীনতা নয়। শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ, দর্শকের রুচি এবং সামাজিক বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল থেকে মানসম্মত নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষাভিত্তিক সৃষ্টিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আরো সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। একটি ধারাকে বন্ধ করে অন্য ধারাকে এগিয়ে নেওয়া নয়, বরং বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার সহাবস্থানই হওয়া উচিত সংস্কৃতিনীতি।

প্রেম মানুষের বিরুদ্ধে নয়; প্রেমই মানুষকে মানুষ করে। তাই প্রেমকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে প্রয়োজন প্রেমের নামে নিম্নমানের, অশালীন বা ক্ষতিকর উপস্থাপনার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতিমালা, বয়সভিত্তিক দর্শন-নির্দেশনা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মাতাদের আত্মদায়বদ্ধতা। 
আমাদের প্রত্যাশা-রাষ্ট্র নিষেধের প্রহরী না হয়ে মানসম্মত শিল্পের পৃষ্ঠপোষক হোক। কারণ সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিকে দমন করে নয়; বরং জ্ঞান, নৈতিকতা, সৌন্দর্য ও দায়িত্বশীল সৃজনশীলতার মধ্যে তার পরিশীলিত বিকাশ ঘটিয়ে। 
সানা/আপ্র/৩০/৮/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

হিমালয়ের প্রলয় থেকে বাংলাদেশকে কঠিন সতর্কবার্তা
২৯ আগস্ট ২০২৬

হিমালয়ের প্রলয় থেকে বাংলাদেশকে কঠিন সতর্কবার্তা

হিমালয়ের বুক চিরে নেমে আসা এক প্রলয়ংকরী জলধারা আবারো প্রমাণ করল, পাহাড়ের বিপর্যয় কখনো শুধু পাহাড়ে সী...

নেপালের দুর্যোগে বৈশ্বিক তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা জরুরি
২৭ আগস্ট ২০২৬

নেপালের দুর্যোগে বৈশ্বিক তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা জরুরি

নেপালে আঘাত হানা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, ধস ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় তিনশ ছুঁয়েছে এবং দেড় শতাধ...

অর্থনীতি ও সুশাসনে এখনই চাই দৃশ্যমান সংস্কার
২৭ আগস্ট ২০২৬

অর্থনীতি ও সুশাসনে এখনই চাই দৃশ্যমান সংস্কার

সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই ছয় মাসে জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল-ভঙ্গুর অর্থনীত...

চার প্রাণের মর্মান্তিক পরিণতি, প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তার ভিত
২৬ আগস্ট ২০২৬

চার প্রাণের মর্মান্তিক পরিণতি, প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তার ভিত

রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও কিশোর ছে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে রোডম্যাপ চান আইনমন্ত্রী

ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধ এবং ভবিষ্যতে কেউ যাতে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে, সে লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ তৈরিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বুধবার (২৬ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মন্ত্রীর চাওয়ার সাথে একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে