রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও কিশোর ছেলে আয়ুশের নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের হৃদয়বিদারক পরিণতি নয়; এটি নাগরিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ তদন্তের সক্ষমতা নিয়ে গভীর প্রশ্নও সামনে এনেছে। যে বাড়িটি ছিল দীর্ঘ জীবনের সঞ্চয়, স্বপ্ন ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতীক, সেই বাড়িতেই এক রাতে নিভে গেল চারটি প্রাণ। পড়ে রইল একটি অসমাপ্ত বাড়ি, আর স্বজনদের জন্য অসহনীয় শূন্যতা।
পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। ইতোমধ্যে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে এবং পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম, খেজুরের বিচি, অর্ধেক খাওয়া শসা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব আলামতের সূত্র ধরে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
তবে এখানেই তদন্তের শেষ নয়; বরং প্রকৃত তদন্তের শুরু। হত্যায় কারা জড়িত-এই প্রশ্নের উত্তরকে অতিসরল কোনো সমীকরণে নামিয়ে আনা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি আগেভাগে একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাও অনুচিত। অতীতে বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া’ নাটক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তদন্তের সাফল্য কেবল দ্রুত আসামি শনাক্ত করার মধ্যে নয়; বরং প্রকৃত অপরাধী, প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটনের মধ্যেই নিহিত।
এই ঘটনায় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন-চারজনকে হত্যার পরও সন্দেহভাজনরা কেন দীর্ঘ সময় বাড়ির ভেতরে অবস্থান করল, কীভাবে তারা গোসল করল, খাবার খেল এবং মাদক সেবন করল, কীভাবে আলামত নষ্টের চেষ্টা করল, কেন ঘরের মালামাল ছড়িয়ে ডাকাতির আবহ তৈরি করা হলো এবং স্বর্ণালংকার নেওয়ার উদ্দেশ্যই বা কী ছিল। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, পরিকল্পনার পেছনে আরো কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করতে হবে।
ঘটনাটি আমাদের আইনশৃঙ্খলার বিপন্ন অবস্থার কথাও স্পষ্ট করে। একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে অপরাধীরা যদি দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলে অবস্থান করতে পারে, তবে প্রশ্ন উঠবেই-অপরাধ প্রতিরোধ, গোয়েন্দা নজরদারি ও স্থানীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার কোথায় দুর্বলতা ছিল? মাদকের বিস্তার, অপরাধীদের বেপরোয়া মানসিকতা এবং অপরাধের পর আলামত নষ্টের সক্ষমতা-সবকিছুকেই একই সঙ্গে দেখতে হবে।
এখন সবচেয়ে প্রয়োজন রাজনৈতিক দোষারোপের পুরোনো সংস্কৃতি পরিহার করে আত্মসমালোচনা ও আত্মপর্যালোচনা। প্রতিটি ভয়াবহ অপরাধের পর বিগত সরকারের ব্যর্থতার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া সহজ; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত সাফল্য হলো বর্তমানের দুর্বলতা শনাক্ত করে তা দূর করা। নাগরিকের নিরাপত্তা কোনো দল, সরকার বা সময়ের একক দায় নয়-এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
তাই এই হত্যাকাণ্ডে দ্রুত বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নির্ভুল তদন্ত। জনমতের আবেগ নয়, প্রমাণই নির্ধারণ করুক অপরাধীর পরিচয়। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, আবার কোনো প্রকৃত অপরাধীও যেন তদন্তের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারেন। মাদক নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ প্রতিরোধ, গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তদন্ত ব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ সমাজ।
গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার তাই শুধু চারটি প্রাণের বিচারের দাবি নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থারও পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় সফল হওয়ার একমাত্র পথ-সত্য উদঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
সানা/আপ্র/২৬/৮/২০২৬