দেশের গ্যাস-সংকটে নতুন এলএনজি কার্গো এসে সাময়িক স্বস্তির বার্তা দিয়েছে। মহেশখালীর এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে আবার পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে, সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এই স্বস্তির আড়ালেই রয়ে গেছে আরো বড় উদ্বেগের বাস্তবতা। দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করেই এত দিন পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। নতুন কার্গো আসার পরও সরবরাহ ২৩৭ কোটি ঘনফুটের আশপাশে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ সংকট কেটে যায়নি; কেবল তার তীব্রতা কিছুটা কমেছে।
এই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিঘাত পড়ছে শিল্পে। প্রায় এক মাসের গ্যাস-সংকটে অন্তত ৩০০ নিট পোশাক কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য নিছক একটি শিল্পখাতের দুর্দশার চিত্র নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুতর সতর্কসংকেত। উৎপাদন ব্যাহত হয়ে রপ্তানি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শ্রমিকের বেতন পরিশোধে উদ্যোক্তাদের সংকট, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারা এবং বিদেশি ক্রয়াদেশ পার্শ্ববর্তী দেশে সরে যাওয়ার আশঙ্কা-সব মিলিয়ে এর অভিঘাত বহুমাত্রিক। একবার আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থা ও ক্রয়াদেশ হারালে তা ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
আরো উদ্বেগের বিষয়, এই সংকট আকস্মিক কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্যোগের ফল নয়। প্রায় নয় বছর ধরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি করা হলেও আমদানিনির্ভরতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। আগস্টে আসার কথা থাকা চারটি কার্গোর একটিও না আসা এবং টার্মিনাল প্রস্তুত থাকার পরও পর্যাপ্ত এলএনজি না থাকায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়া ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতারই ইঙ্গিত দেয়।
সরকার প্রতিটি জ্বালানি খাতে তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, তা অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। তবে লক্ষ্যকে কেবল ঘোষণা হিসেবে রাখলে চলবে না; এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট সময়সীমা, দায়িত্ব নির্ধারণ, জবাবদিহি এবং নিয়মিত জনসম্মুখে অগ্রগতি প্রকাশ। জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, শিল্প, কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।
তাই এখন প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রূপান্তরের সুসংহত নীতি। নতুন ভাসমান ও স্থলভিত্তিক পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনাল, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পাইপলাইন সম্প্রসারণ এবং আমদানির বহুমুখীকরণ-সব ক্ষেত্রেই দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে কার্গো সংগ্রহে অনিয়ম, বিলম্ব কিংবা সরবরাহ ব্যর্থতার ঝুঁকি কমাতে স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য ক্রয়ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
দেশের শিল্পকে উৎপাদন বন্ধ রেখে, শ্রমিককে অনিশ্চয়তায় রেখে এবং রপ্তানিকারকদের ক্রেতা হারানোর ঝুঁকিতে ফেলে কোনো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তাই আজকের সাময়িক গ্যাসস্বস্তিকে সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি না ধরে এটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সূচনা হিসেবে দেখতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই শিল্পের চাকা সচল রাখা, কর্মসংস্থান রক্ষা করা এবং বৈদেশিক বাজারে বাংলাদেশের আস্থা অটুট রাখা।
অতএব, এখন শুধু সংকট সামলানোর নয় সময়, সংকট যেন বারবার ফিরে না আসে, সেই নিশ্চয়তা নির্মাণের।
সানা/আপ্র/২৪/৮/২০২৬