বাংলাদেশের রাষ্ট্রজীবনে যুক্ত হলো একটি নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। শুক্রবার (২১ আগস্ট) বঙ্গভবনে তাঁর শপথ গ্রহণ তাই নিছক একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের কাছে নতুন প্রত্যাশা, নতুন দায়িত্ব এবং নতুন সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচিত হয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন স্বজ্জন, পরিমিতিবোধসম্পন্ন ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা, সংকট ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে তিনি পথ চলেছেন। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলটির কঠিন সময়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন, মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত সৌজন্য ও সংযত বক্তব্যের জন্য তিনি নিজ দলের বাইরে বিভিন্ন মহলেও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন। এখন সেই রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হবে সমগ্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে।
রাষ্ট্রপতি কোনো দলের নন, তিনি রাষ্ট্রের প্রতীকী অভিভাবক। তাই নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে দেশবাসীর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা-তিনি যেন সংবিধান, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের প্রতি অবিচল থেকে রাষ্ট্রের বিভাজন দূর করার ক্ষেত্রে নৈতিক ও দিকনির্দেশক ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিভক্তির সংস্কৃতি জাতীয় অগ্রযাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। এই বাস্তবতায় মির্জা ফখরুল তাঁর অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে যদি রাজনৈতিক বিভাজনের দেয়াল পেরিয়ে জাতীয় ঐক্যের সেতু নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটিই হবে তাঁর রাষ্ট্রপতি জীবনের অন্যতম বড় অর্জন।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যে বাংলাদেশ বিভক্তি-বিভাজনের ভারে ন্যুব্জ নয়; যে রাষ্ট্রে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে থাকবে ঐক্য; রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; সরকার ও বিরোধী পক্ষের অবস্থান ভিন্ন হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থে থাকবে অভিন্ন অঙ্গীকার। নতুন রাষ্ট্রপতি সেই শুদ্ধ পথের সন্ধানে নৈতিক প্রেরণার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেন-এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
একই দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় আরো ছয়জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর অন্তর্ভুক্তিও নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। আবদুল মঈন খান, আন্দালিভ রহমান পার্থ, সাচিং প্রু জেরী, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, হুমায়ুন কবির ও শামীম কায়সার লিংকনের দায়িত্ব গ্রহণ সরকারের কর্মপরিধি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত স্থানীয় সরকার, তথ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম, পর্যটন, পররাষ্ট্র ও ধর্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা জনকল্যাণে কতটা কাজে লাগে, সেটিই হবে আসল বিবেচনা।
মন্ত্রিসভার কলেবর বাড়ানো তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর সুফল সরাসরি মানুষের জীবনে পৌঁছাবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি, প্রশাসনে জবাবদিহি, উন্নয়নে সমতা এবং জনসেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন-নতুন মন্ত্রীদের কাছ থেকে জনগণ সেটিই প্রত্যাশা করবে।
নতুন রাষ্ট্রপতি ও নতুন দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রীদের সামনে তাই সময়ের দাবি একটিই-ক্ষমতার পরিসর নয়, জনআস্থার পরিসর বাড়ানো। রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞা ও নৈতিক নেতৃত্ব এবং সরকারের কর্মদক্ষতার সমন্বয়ে বাংলাদেশ যেন বিভাজন পেরিয়ে ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির শুদ্ধ পথ খুঁজে পায়-এই হোক নতুন দিনের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
সানা/আপ্র/২৩/৮/২০২৬