গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

মেনু

আলোকচিত্রীদের বড় সংকট স্মার্টফোননির্ভর এআই ফটোগ্রাফি

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:০১ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২১:৪২ এএম ২০২৬
আলোকচিত্রীদের বড় সংকট স্মার্টফোননির্ভর এআই ফটোগ্রাফি
ছবি

ছবি সংগৃহীত

দেশে-বিদেশে ফটোগ্রাফি মাধ্যমটি নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যম ও বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো আলোচিত্রীদের বদলে ভিডিও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, হাতে হাতে মোবাইলফোন থাকায় পেশাদার আলোকচিত্রীদের ডাকপড়া অস্বাভাবিক হারে কমেছে এবং বিশ্ববাজারে ক্যামেরার দাম বেড়েই চলেছে। আরো আছে ফটোশপের অপব্যবহার। জীবন এখন অনেকটাই স্মার্টফোননির্ভর।স্মার্টফোনগুলোর প্রধান ফিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্যামেরা। কোন ব্র্যান্ড কত ভালো ক্যামেরা মোবাইলফোন দিতে পারলো, এর ওপর নির্ভর করছে কাটতি। ডিজিটাল ক্যামেরার অনেক কাজই এখন করে ফেলা যাচ্ছে মোবাইলফোন ক্যামেরা দিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই পেশাদার আলোকচিত্রীদের চাহিদা কমেছে। তাদের কাজ সীমিত হয়ে পড়ছে। এ বিষয় নিয়েই এবারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাতার প্রধান ফিচার

আলোকচিত্রকলা এতটা উদার হয়েছে- যেখানে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) নির্মিত ছবিকেও অন্তর্ভুক্ত করা যায়, নাকি তা করা ভুল হবে? এই আলোচনার আহ্বানটি জানিয়েছিলেন জার্মান দৃশ্যশিল্পী বোরিস এলডাগসেন। আলোচনাটি করা কেন জরুরি তা তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েও দিয়েছিলেন।

২০২৩ সালের বিশ্বখ্যাত ‘সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস’ প্রতিযোগিতায় তিনি একটি জমা দিয়েছিলেন। সাদাকালো ছবিতে দুই প্রজন্মের দুই নারীকে দেখা যায়, একজন সামনে আরেকজন প্রথম নারীর পেছনে। পেছন দিক থেকে তিনি সামনের নারীকে জড়িয়ে ধরেছেন, তার মুখটি সামনের নারীর কাঁধে ঠেকানো। ছবিটির শিরোনাম ছিল ‘সুডোমনেশিয়া: দ্য ইলেকট্রিশিয়ান’। ছবিটি ওই প্রতিযোগিতার সৃজনশীল ফটোগ্রাফি বিভাগে প্রথম পুরস্কার অর্জন করে। পুরস্কার পাওয়ার পরপরই বোরিস এলডাগসেন নিজের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দেন, পুরস্কার পাওয়া ছবিটি তিনি এআই দিয়ে তৈরি করেছেন! তিনি পুরস্কারটি প্রত্যাখ্যান করেন। বললেন, সবাইকে বোকা বানিয়ে পুরস্কার বাগানো তার উদ্দেশ্য ছিল না, প্রতিযোগিতার বিচারকদের পরীক্ষা করতে তিনি ছবি জমা দিয়েছিলেন। এআই আসার পর থেকে অনেকে ২০০ বছরের প্রাচীন ফটোগ্রাফি মাধ্যমের ভবিষ্যৎ সুবিধার কথা মনে করছে না। আবার অনেকে এআইয়ের মাধ্যমে ফটোগ্রাফির পুনর্জাগরণের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছে না। 
   
রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ‘ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৫’ বলছে, সংবাদ দিনদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও নির্ভর হয়ে উঠছে এবং ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্লাটফর্মে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সারদের গুরুত্ব বাড়ছে। ফলে পিছিয়ে পড়ছে ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমগুলো। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ২০২৫-২০২৬ সালে আসা বেশ কিছু ডিজিটাল গণমাধ্যম ফটোসাংবাদিক বা আলোকচিত্রীদের জন্য কোনো জায়গাই রাখেনি। অন্যদিকে ভালো ডিজিটাল ক্যামেরার দাম হু হু করে বাড়ছে। এর প্রধান কারণ, বিশ্ববাজারে ক্যামেরার অন্যতম জরুরি যন্ত্রাংশ মেমোরি চিপের দাম বেড়ে গেছে। শুধু নতুন নয়, সেকেন্ড হ্যান্ড ক্যামেরার দামও বেড়েছে। কেন? উত্তর সহজ, নতুন ক্যামেরার দাম বাড়ায় ক্রেতারা ঝুঁকেছেন পুরনো ক্যামেরার দিকে, ফলে পুরনো ক্যামেরার বাজারে চাহিদার চাপ পড়ছে।    

ফটোশপ নিজেই এখন একটি ক্রিয়া। এর অর্থ—ছবির বাস্তবতাকে বিকৃত করা। এই বিকৃতির মাধ্যমে কত মানুষের জীবন যে ধ্বংস হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। নানা প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যা বয়ান তৈরির বেলায়ও ফটোশপিং ব্রাহ্মাস্ত্রের মতো কাজে দেয়। এসবের ওপর যুক্ত হয়েছে এআইয়ের ভয়। ফটোগ্রাফির জন্য এআই একইসঙ্গে হুমকি ও সম্ভাবনা। এআই আলোকচিত্র সদৃশ ছবি উৎপাদনে সক্ষম। আপনি কী ধরনের ছবি চান তা লিখে দিলেই হলো, এআই অল্প সময়ের মধ্যে তা উৎপাদন করে। সুতরাং অনেকে মনে করছে, যে কাজ মিনিটেই এআইয়ের মাধ্যমে করা যায়- সে কাজের জন্য পয়সা খরচ করে লোক নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। ফলে চাকরি হারাচ্ছে আলোকচিত্রীরা।

যুক্তরাজ্যের ‘দ্য অ্যাসোসিয়েশন অব ফটোগ্রাফার্স’ (এওপি) ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এক জরিপ ফলাফল প্রকাশ করেছিল। সেই জরিপ অনুযায়ী ৫৮ শতাংশ আলোকচিত্রী এআইয়ের কারণে কাজ হারিয়েছেন। একই সঙ্গে কমিশন পাওয়া ছবি ৬৫ শতাংশ কমেছে এবং অনলাইনে প্রকাশিত ছবির সংখ্যাও কমেছ ৪৬ শতাংশ। এই হলো সেই ভয়ের একটি দিক। ভবিষ্যতে ভয় আরও ব্যাপক হতে পারে। এআইয়ের কারণে আলোকচিত্রীরা শুধু কাজই হারাচ্ছে না। মেধাস্বত্বও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বাংলাদেশের উদাহরণ দেওয়া যায়। আজকাল কারও তোলা ছবি নিয়ে, এআইয়ে ফেলে, সামান্য পরিবর্তন করে (আপস্কেল) এআই জেনারেটেড ছবি হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ছবিটি ব্যবহারে মূল ছবির আলোকচিত্রীর নামও নেওয়া হচ্ছে না। সম্প্রতি জানা গেল, এআই প্রশিক্ষণে স্ক্যানের পর ধ্বংস করা হচ্ছে লাখ লাখ দুর্লভ বই। এআই কোম্পানিগুলো আলোকচিত্রের বেলায়ও এমনটি করছে কিনা কে জানে!

এআই দিয়ে কোনো ছবিকে আপস্কেল করার মাধ্যমে ভুল বা অপতথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়। আপস্কেলের মাধ্যমে এআই আসলে পুরো আলোকচিত্রটিকেই পুনর্গঠন করে। এটি করতে গিয়ে এআই মূল ছবিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। ছবিতে যে যেমন দেখতে তা আর অটুট থাকে না। ছবির নানা অবজেক্টেও হাত দেয় এআই। এআই কলাকে মুলায় রূপান্তর অহরহ করছে। এভাবেই তৈরি হতে পারে তথ্যবিভ্রাট। যে বিড়ম্বনা এখন বিশ্ববাসীকে পোহাতে হচ্ছে তা হলো, বুঝার উপায় প্রায় থাকছেই না—কোনটি আলোকচিত্র আর কোনটি এআই-নির্মিত ‘আলোকচিত্র’। এই পার্থক্য করতে না পারার কারণে কাল্পনিক ছবিটিকেই আলোকচিত্র মনে করে বসছি। এর ফলে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ছে, অনেক সময় সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি হচ্ছে। এখন আর আগের মতো মূল ছবি কেটেকুটে বিকৃত করতে হচ্ছে না, একটি আস্ত বিকৃত ছবিই উৎপাদন করা যাচ্ছে- যা দেখতে হবে একদম আসল আলোকচিত্রের মতো।

আসলে এআইয়ের তৈরি ছবি আলোকচিত্র নয়। আলোকচিত্রের মতো দেখালেও তা আসলে এআই টুলের কল্পনাপ্রসূত ‘ফটোরিয়ালিস্টিক’ ছবি। এআইয়ের দাপটে হাতে আঁকা ছবি ও অলংকরণের চাহিদা শেষ হয়ে যাবে কি যাবে না- তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন, কিন্তু এআই যতই শক্তিশালী হোক আলোকচিত্রের প্রয়োজনীয়তা একেবারে শেষ হয়ে যাবে না- তা জোর দিয়ে বলা যায়। কারণ আলোকচিত্র তো শুধু শিল্প নয়, বাস্তবজীবনের কোনো এক মুহূর্তের প্রতিচ্ছবিও। ক্যামেরার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বাদ দিলেও, তার যে বাস্তব মুহূর্তকে ধারণ করার ক্ষমতা- শুধু এ জন্য হলেও ক্যামেরা টিকে থাকবে। এআই সর্বোচ্চ হাইপাররিয়ালিস্টিক ছবি মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করে ফেলতে পারলেও তাতে থাকে না প্রকৃত বাস্তবতা। তাকে সত্যিকার অর্থে বাস্তবতাকে ধরতে হলে ক্যামেরার সহযোগিতাই নিতে হবে অথবা করতে হবে কোনো আলোকচিত্রের কপি।          

তর্কের খাতিরে এআইকে যদি আলোকচিত্রের পথের কাঁটা হিসেবে ধরে নিইও—তাহলে কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হবে। ওই যে বললাম, এআই-নির্মিত ছবি অনেক সময় অপতথ্য ছড়ায়। কোনো আলোকচিত্র নিয়ে সন্দেহ হলে আমরা কিন্তু এআইয়ের কাছেই জানতে চাইতে পারি, ছবিটি আদৌ আসল কিনা। আবার এই এআই দিয়েই পুরনো ও অস্পষ্ট আলোকচিত্রের পুননির্মাণ এবং আলোকচিত্রের বিশ্লেষণ করতে পারি। যেসব গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রের পেছনের ইতিহাস এতদিন অজানা ছিল, তা এখন জানা যাচ্ছে এআই টুলের সাহায্যে। সুতরাং এআইকে আলোকচিত্রের শত্রু হিসেবে না দেখে তাকে মিত্র করে নেওয়া জরুরি।

কেএমএএ/আপ্র/২৩.০৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

‘ইন্টারনেট’ আর ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ দিবস এক নয়
২৩ আগস্ট ২০২৬

‘ইন্টারনেট’ আর ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ দিবস এক নয়

অনেকেই ‘ইন্টারনেট’ আর ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’কে (ডডড) একই বিষয় ভেবে ভুল করি। সেই ভুল ভাঙানোর জন্যই হয়ত...

সপ্তাহজুড়ে প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে দাম স্থিতিশীল
২৩ আগস্ট ২০২৬

সপ্তাহজুড়ে প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে দাম স্থিতিশীল

চলতি সপ্তাহে ঢাকার বিভিন্ন কম্পিউটার বাজারে প্রযুক্তিপণ্যের দামে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাজারে র‌্...

উসাইন বোল্টকে ছাড়িয়ে রোবট সুপারম্যানে বিশ্ব রেকর্ড
২৩ আগস্ট ২০২৬

উসাইন বোল্টকে ছাড়িয়ে রোবট সুপারম্যানে বিশ্ব রেকর্ড

বিশ্বের দ্রুততম মানব উসাইন বোল্টকে দৌড়ে হারিয়ে দিতে সক্ষম নতুন মানবাকৃতির রোবট তৈরি করেছেন চীনের বিজ...

সবকিছুতে পারদর্শী এআই জানে না অ্যানালগ ঘড়ির সময়
২৩ আগস্ট ২০২৬

সবকিছুতে পারদর্শী এআই জানে না অ্যানালগ ঘড়ির সময়

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। তাই জেনারেটিভ এআই মাত্র...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

চাঁদাবাজদের সঙ্গে পুলিশ জড়িত থাকলেও তালিকা হবে

সারাদেশে চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরির পাশাপাশি এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদেরও তালিকা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরসহ দেশের সব মহানগর এলাকায় চিহ্নিত চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তাঁদের ধরতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মন্ত্রী। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন মন্ত্রীর এই বক্তব্যে চাঁদাবাজিসহ অপরাধ কমবে?

মোট ভোট: ০ | শেষ আপডেট: 19 ঘন্টা আগে