গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

মেনু

একজন শিক্ষকের অপমৃত্যু, আমাদের বিবেকের পরীক্ষা

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৩১ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২১:১৪ এএম ২০২৬
একজন শিক্ষকের অপমৃত্যু, আমাদের বিবেকের পরীক্ষা
ছবি

ছবি সংগৃহীত

আবু সাঈদ মো. নাজমুল হায়দার    

একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; তিনি একটি সমাজের বিবেকও জাগিয়ে রাখেন। তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবই শেখান না, শেখান ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। তাই কোনো শিক্ষক যখন মাদক, জুয়া কিংবা সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তার সেই অবস্থানকে নিছক ব্যক্তিগত উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের নৈতিক দায়বদ্ধতা।

লালমনিরহাটের শিক্ষক আরিফুল ইসলামের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সামনে সেই কঠিন প্রশ্নটিই হাজির করেছে- আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করছি, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মূল্য দিতে হয় জীবন দিয়ে?

আরিফুল ইসলাম লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের তুষভান্ডার সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ছিলেন। সংবাদ মাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকার তরুণ সমাজকে মাদক ও জুয়ার ভয়াবহতা থেকে দূরে রাখতে তিনি নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ নামে সামাজিক আন্দোলনের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। নিজের এলাকায় প্রকাশ্যে চলা অনলাইন জুয়া ও মাদকের আখড়া বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি জুয়ার চক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার সেই অবস্থানই তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।

কলেজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে ১ আগস্ট দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় এলোপাতাড়ি কোপানো হয় তাকে। রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকা আরিফুলকে উদ্ধার করে প্রথমে লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল ও পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আট দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ২১ আগস্ট তিনি মৃত্যুর কাছে হার মানেন। কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়টি সম্ভবত তার মৃত্যুর বাইরেও। আরিফুল যখন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন, ঠিক তখনই তার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখেছে। একটি ফুটফুটে শিশু জন্ম নিয়েছে—কিন্তু বাবা হিসেবে আরিফুল সন্তানের মুখ দেখতে পারেননি। নবজাতকের প্রথম কান্না, প্রথম স্পর্শ কিংবা প্রথম হাসি—কিছুই ভাগ করে নেওয়া হলো না তার সঙ্গে।

একদিকে নতুন প্রাণের আগমন, অন্যদিকে একজন বাবার মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই—একটি পরিবারের জন্য এর চেয়ে নির্মমতা আর কী হতে পারে? এখন সেই শিশুটিকে বড় হবে বাবাকে ছাড়াই। নিষ্পাপ শিশুটির মা স্বামীহারা হয়ে সন্তানকে নিয়ে নতুন জীবনসংগ্রামে নামবেন। একজন বৃদ্ধ বাবা হারিয়েছেন তার সন্তানকে। আরিফুলের বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, ছেলের কোনো অপরাধ ছিল না; সে শুধু সমাজটাকে ভালো রাখতে চেয়েছিল। এ জায়গাতেই আরিফুল ইসলামের মৃত্যু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির সীমা ছাড়িয়ে আমাদের জাতীয় বিবেকের প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না; ধ্বংস করে পরিবার, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। জুয়া শুধু অর্থের ক্ষতি করে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতারণা, ঋণ, পারিবারিক অশান্তি এবং নানা ধরনের অপরাধ। একজন শিক্ষক প্রতিদিন তরুণদের নিয়ে কাজ করেন। তাই তার চোখে এসব কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়- এগুলো একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের আশঙ্কা। এ কারণেই আরিফুল ইসলামের প্রতিবাদকে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধের ফল হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি যে কাজটি করেছিলেন, সেটি ছিল সামাজিক দায়িত্ব পালনেরই অংশ। কিন্তু আমাদের সমাজের দুর্ভাগ্য হলো, অনেক সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে যারা কথা বলেন, তারাই সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

‘আমার কী দরকার’- এই মানসিকতা, সামাজিক ভয়, অপরাধী চক্রের প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং বিচারহীনতা মানুষকে নীরব করে দেয়। আর নীরবতা যখন সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তখন অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। তাই একজন শিক্ষককে হত্যা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; এটি একটি মূল্যবোধের ওপর আঘাত। কারণ আমরা শিক্ষার্থীদের বলি- অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, সত্যের পক্ষে কথা বলো। কিন্তু যে শিক্ষক সেই শিক্ষাই বাস্তবে প্রয়োগ করতে গিয়ে নিরাপদ থাকেন না, তখন শিক্ষার্থীরা আমাদের কাছ থেকে আসলে কী শিক্ষা পাবে?

এখানে আরো একটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ দমনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যতা গুরুত্বপূর্ণ, নাগরিক উদ্যোগও ততাই গুরুত্বপূর্ণ। সব অপরাধ পুলিশ একা প্রতিরোধ করতে পারে না। একজন শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী কিংবা সচেতন নাগরিক যখন কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তখন তিনি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থাকে সহায়তা করেন। তার সেই উদ্যোগকে ঝুঁকি হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের সহযোগিতার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নাগরিক উদ্যোগের সঙ্গে যদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে মানুষ সামাজিক দায়িত্ব থেকে সরে যাবে। এই বাস্তবতায় আরিফুল ইসলামের মৃত্যু একটি সতর্কবার্তা। সমাজের সব ভালো মানুষকে যদি আমরা কেবল বিপদের সময় প্রশংসা করি, তাদের কাজের সময় পাশে না দাঁড়াই; তাহলে ভবিষ্যতে কেউ সামনে আসতে চাইবেন না। ফলে অপরাধীরা আরো সংগঠিত হবে এবং সাধারণ মানুষ আরো অসহায় হয়ে পড়বে। এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত প্রয়োজন। হামলায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি এর পেছনে কোনো পরিকল্পনাকারী, পৃষ্ঠপোষক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।

বিচার দৃশ্যমান না হলে শুধু একটি পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে না; সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা যাবে- অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নিরাপদ নয়। একই সঙ্গে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু অভিযান, গ্রেপ্তার বা মোবাইল কোর্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, সামাজিক সংগঠন ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, দক্ষতা উন্নয়ন ও ইতিবাচক সামাজিক সম্পৃক্ততার সুযোগও বাড়াতে হবে। কারণ শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মাদক বা জুয়ার আকর্ষণ কমানো যায় না; তরুণদের সামনে বিকল্প স্বপ্নও তৈরি করতে হয়। আর যারা এই লড়াইয়ে সামনে থেকে কাজ করবেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিযোগ জানানোর পর তাদের ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা এবং দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার।

নাগরিককে অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলব; অথচ দাঁড়ানোর পর তাকে একা ছেড়ে দেব- এটি কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না। আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন সমাজ- যেখানে অপরাধীর ভয়ে ভালো মানুষ চুপ করে থাকবেন; নাকি এমন সমাজ- যেখানে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষ জানবেন। তিনি একা নন, রাষ্ট্র ও সমাজ তার পাশে আছে?

একজন শিক্ষকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু শোকবার্তায় নয়। তার প্রতি শ্রদ্ধা হবে অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা; মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা; এবং প্রতিবাদী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আরিফুল ইসলাম তার সন্তানকে কোলে নিতে পারেননি। কিন্তু তার প্রতিবাদের শিক্ষা আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। ওই শিক্ষা আমরা গ্রহণ করব, নাকি তার মৃত্যুকেও একদিনের সংবাদে পরিণত করব- সিদ্ধান্ত এখন আমাদের। কারণ কোনো সমাজের নৈতিক শক্তি পরিমাপ করা হয় সেখানে অপরাধ কত কম, শুধু তা দিয়ে নয়; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ কতটা নিরাপদ, তা দিয়েও। তাই আরিফুল ইসলামের মৃত্যু আমাদের শোকের পাশাপাশি আত্মসমালোচনারও সুযোগ করে দিয়েছে। তার রক্ত যেন কেবল একটি পরিবারের কান্নায় হারিয়ে না যায়; বরং আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক দায়িত্বের প্রতি নতুন করে জাগিয়ে তুলুক। একজন শিক্ষককে হারিয়ে আমরা যেন শুধু একজন মানুষকে হারিয়ে না ফেলি- হারিয়ে না ফেলি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসটুকুও।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/২৩.০৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

সুরক্ষাবলয়ে ফাটল: হামের কাছে কেন হার মানছে শিশুরা?
২৩ আগস্ট ২০২৬

সুরক্ষাবলয়ে ফাটল: হামের কাছে কেন হার মানছে শিশুরা?

ড. আনোয়ার খসরু পারভেজমাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে হাজারের উপরে শিশুর মৃত্যু এবং হাজার হাজার শিশুর আক্রা...

বদলেছে মশা, আমাদের কৌশল কি বদলেছে?
২২ আগস্ট ২০২৬

বদলেছে মশা, আমাদের কৌশল কি বদলেছে?

ড. কবিরুল বাশারগত ২০ আগস্ট ছিল বিশ্ব মশা দিবস। ১৮৯৭ সালের এই দিনে ব্রিটিশ চিকিৎসাবিজ্ঞানী স্যার রোনা...

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নিদারুণ দূষণ
২২ আগস্ট ২০২৬

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নিদারুণ দূষণ

তুষার দাশশিক্ষার বিষয়টি তো মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি অংশ। সেই অধিকার থেকে একটি দেশের বিরাট জনগোষ্ঠ...

প্রেমময় রবিউল আউয়াল
২২ আগস্ট ২০২৬

প্রেমময় রবিউল আউয়াল

মাহমুদ আহমদ===   মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার কৃপায় আমরা পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

চাঁদাবাজদের সঙ্গে পুলিশ জড়িত থাকলেও তালিকা হবে

সারাদেশে চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরির পাশাপাশি এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদেরও তালিকা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরসহ দেশের সব মহানগর এলাকায় চিহ্নিত চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তাঁদের ধরতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মন্ত্রী। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন মন্ত্রীর এই বক্তব্যে চাঁদাবাজিসহ অপরাধ কমবে?

মোট ভোট: ০ | শেষ আপডেট: 18 ঘন্টা আগে