মাহমুদ আহমদ===
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার কৃপায় আমরা পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস অতিবাহিত করেছি, আলহামদুলিল্লাহ। মুসলিম উম্মাহর কাছে এ মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। আরবি (হিজরি) ক্যালেন্ডারের হিসাবে রবিউল আউয়াল মাস তৃতীয় মাস। এ মাসে দুনিয়ায় আগমন করেছেন রাহমাতুল্লিল আলামিন ও শ্রেষ্ঠ নবি হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
নবিকুল শিরোমণি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমগ্র জীবন অতিবাহিত হয়েছে মানুষের মুক্তি সাধন, ঐক্য বিধান ও সুসভ্য করে গড়ে তোলার জন্য। আল্লাহর নবিগণের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যার জীবনের প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি ঘটনা ইতিহাসের অন্তর্গত। সারা জাহান যখন জুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতনের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত, ঠিক তখনই পবিত্র এই রবিউল আউয়াল মাসে মহান আল্লাহপাক হজরত মুহাম্মদ (সা.)কে পাঠিয়েছেন মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে।
পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস মাসটি তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে-এর প্রথম কারণ হলো বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত নবি করিম (সা.)-এর পৃথিবীতে আগমন। দ্বিতীয় কারণ হলো-এ মাসেই আম্মাজান খাদিজাতুল কুবরা (রা.)কে বিয়ে করেন আল্লাহর রাসূল (সা.)। তৃতীয় কারণ হলো-এ মাসেই মুসলমানদের জন্য প্রথম মসজিদ তৈরি করা হয় কুবা নামক স্থানে এবং এটিই ইসলামের ইতিহাসে নির্মিত প্রথম মসজিদ। চতুর্থ কারণ হলো-এ মাসে আল্লাহর রাসূল (সা.) প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন এবং যেদিন তিনি মদিনায় পৌঁছান তা ছিল সোমবার ১২ রবিউল আউয়াল।
পঞ্চম কারণ হলো-এ মাসেই বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর আরোপিত রিসালাতের দায়িত্ব পালন শেষে দ্বীন-ইসলাম পূর্ণতার মাধ্যমে নিজের প্রভুর আহ্বানে সাড়া দেন তিনি। পবিত্র এ মাসে মহানবির (সা.) সুন্দর ও উত্তম আদর্শে নিজেদের প্রতিটি কর্মকে ইসলামের আলোকে আলোকিত করে তুলতে হবে।
আমরা যদি মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতুলনীয় আদর্শ নিজেদের মাঝে ধারণ করে জীবন পরিচালনা করি, তবেই না আমরা তার প্রকৃত উম্মত বলে দাবি করতে পারব।
কেননা মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসা এবং তার প্রতি প্রেমের পুষ্পমাল্য ও মোহন-শ্রদ্ধার্ঘ্য পেশ করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
মহানবি (সা.) ছিলেন সারা বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ। জন দরদি এই নবি (সা.) মানুষকে সকল প্রকার পঙ্কিলতা, অনিয়ম, অনাচার, পাপাচার ও অন্ধকারের বেড়াজাল হতে মুক্ত করতে আজীবন চেষ্টা চালিয়েছেন, সংগ্রাম করেছেন। তার সংগ্রাম ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠার, তিনি রাজ্য দখলের জন্য সংগ্রাম করেননি। সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা না পর্যন্ত তিনি ক্ষান্ত হন নাই। নিজে বহু কষ্ট করেছেন, নানা বাধা বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছেন, জীবনের ওপরে বার বার হুমকি এসেছে, তবুও তিনি পিছিয়ে যান নি। একাধারে বিরামহীন চেষ্টা এবং অক্লান্ত পরিশ্রম দ্বারা তিনি জয়যুক্ত হয়েছেন। এভাবে সে কালের ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেবল মক্কা শহর বা সেই দেশ বা সেই যুগের লোকদের জন্যই আবির্ভূত করেন নি। তিনি (সা.) কেয়ামত পর্যন্ত সারা দুনিয়ার মানুষ ও জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছেন। তার (সা.) মাধ্যমে পৃথিবীতে শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে বার বার এই ঘোষণা করা হয়েছে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পৃথিবীর বিলুপ্তি সময় পর্যন্ত সর্বমানবের জন্য ‘রাসুল’ রূপে পাঠানো হয়েছে।
মানবেতিহাসে তার আবির্ভাব এক অনুপম ঘটনা। এর উদ্দেশ্য সকল পৃথক পৃথক জাতি ও বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীকে একই ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করা, যেখানে জাতি, ধর্ম ও বর্ণজনিত সকল ভেদাভেদ বিলীন হয়ে যাবে। আজকে সমগ্র বিশ্ব যদি মহানবির (সা.) জীবনাদর্শের ওপর থেকে জীবন পরিচালনা করতো তাহলে বিশ্বময় এত নৈরাজ্য পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো না।
মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার একটি অনুপম দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি।
হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, আমি মহানবি (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম আর তিনি (সা.) মোটা পাড়ের চাদর পরিহিত অবস্থায় ছিলেন। একজন বেদুইন এসে সেই চাদর ধরে এত জোরে হেঁচকা টান দেয় যে, যার কারণে মহানবির (সা.) গলায় চাদরের পাড়ের দাগ পড়ে যায়। এরপর সে বলে, হে মুহাম্মদ (সা.)! আল্লাহ প্রদত্ত এই সম্পদ দিয়ে আমার এই দু’টি উট বোঝাই করে দিন, কেননা আপনি আমাকে আপনার নিজস্ব সম্পদ থেকেও কিছু দিচ্ছেন না আর আপনার পৈতৃক সম্পদ থেকেও দিচ্ছেন না।
একথা শুনে প্রথমে মহানবি (সা.) নীরব থাকেন এরপর বলেন, ‘আল মালু মালুল্লাহি ওয়া আনা আবদুহু’ অর্থাৎ সমস্ত সম্পদ আল্লাহরই আর আমি তার এক বান্দা মাত্র। এরপর তিনি (সা.) বলেন, আমাকে যে কষ্ট দিয়েছ তোমার কাছ থেকে এর প্রতিশোধ নেয়া হবে। তখন এই বেদুইন বলল, না! মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, কেন প্রতিশোধ নেয়া হবে না? সে বলল, কেননা আপনি মন্দকে মন্দ দিয়ে প্রতিহত করেন না।
আমাদের চিন্তা করার বিষয়, কত অতুলনীয় ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার দৃষ্টান্তই মহানবি (সা.) প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এই উত্তম আদর্শ তিনি শুধু মুসলমানদের সাথেই করতেন না বরং ইসলাম বিরোধী শত্রুদের প্রতিও প্রদর্শন করেছেন।
শ্রেষ্ঠনবি হজরত রাসুল করিম (সা.) আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনুসরণীয় আদর্শ। তার (সা.) পারিবারিক জীবন যেমন সুখময় সুন্দর ছিল, তেমনি তিনি তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অসাধারণ মানব রাসুল ছিলেন। যার মর্যাদা তুলনাহীন, অসীম। আমরা যেন জীবনে মহানবির (সা.) উত্তম পারিবারিক জীবন থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উত্তম প্রতিফলন ঘটাতে পারি।
তাই শুধু পবিত্র এ রবিউল আউয়াল মাসেই নয় বরং পুরো বছর জুড়ে আমরা যেন মহানবির (সা.) জীবনী পাঠ এবং আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। সেই সাথে তার অতুলনীয় জীবনাদর্শ অনুসরণের অঙ্গীকার করি।
কেননা, শান্তি-সম্প্রীতিতে ভরা সমৃদ্ধ দেশ গড়তে বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।
সানা/আপ্র/২২/৮/২০২৬