আবু তাহের খান
সব শিল্পের পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের হাতে রেখে শুধু জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ মোটেও যুক্তিযুক্ত ছিল না; বরং ছিল ওইসব শিল্প কর্তৃক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকাণ্ডগুলোকে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার শামিল। আর আইন প্রণয়ন ও বোর্ড গঠন-উত্তর সময়ে এর প্রমাণও পাওয়া গেছে
শিল্প ও প্রযুক্তির নানামাত্রিক প্রসার ও প্রয়োগের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে মানুষের জীবন ক্রমেই সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে এ সহজ জীবনের জন্য নানা বিসর্জনও করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার পশ্চিমের শিল্পোন্নত দেশগুলো। শিল্পের দূষণ ও তেজস্ক্রিয়তায় দেশগুলোর তাপমাত্রা ও উষ্ণতা বেড়ে গেছে। এটি শত শত মানুষের প্রত্যক্ষ মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এতদিন মনে করা হতো যে, বাংলাদেশের মতো শিল্পে অনগ্রসর দেশগুলো ব্যাপক কোনো দূষণ সৃষ্টি না করেও তাদেরকে শিল্পোন্নত দেশসমূহের কর্মকাণ্ডের মাশুল গুনতে হচ্ছে। কিন্তু সর্বশেষ পর্যায়ে লক্ষ করা যাচ্ছে যে, শিল্পে অনগ্রসর না হয়েও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো নিজেদের ভ্রান্ত নীতি ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার কারণে অতি সীমিত সংখ্যক শিল্পের মাধ্যমেই তুলনামূলক হারে অনেক বেশি দূষণ সৃষ্টি করে ফেলছে। এর সর্বসাম্প্রতিক উদাহরণ জাহাজভাঙা শিল্প। এ শিল্পে দূষণের মাত্রা এতাই বেশি ও ভয়ংকর যে, তদজনিত ক্ষয়ক্ষতির হার শিল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির হারকেও (পরিমাণকে নয়) ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জাহাজভাঙা শিল্প অনেক লাভজনক হলেও এ শিল্পের ঝুঁকি হ্রাসে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। বণিক বার্তার প্রতিবেদনেও এর বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।
জাহাজভাঙা শিল্পের মূল উপকরণ হচ্ছে পরিত্যক্ত ও আগে বিভিন্ন ধরনের তেজস্ক্রিয়তাপূর্ণ দ্রব্য (কখনো কখনো পারমাণবিক বর্জ্যও) বহনকারী জাহাজ। এসব জাহাজের মালিকানা আছে যে দেশগুলোর, সেগুলো জাহাজ সরাতে চাচ্ছে। কিন্তু নিজ দেশের ও আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা মানতে গিয়ে তারা তা নিজেদের সীমানায় ধ্বংস বা পরিত্যাগ করতে পারছে না। এরূপ পরিস্থিতিতে এসব জাহাজ তারা বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে অন্যদেরকে গছিয়ে দিতে চাচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ তা বিনামূল্যে দেয়ার পাশাপাশি সেগুলো গ্রহীতা দেশে পৌঁছে দেয়ার পরিবহন ব্যয়ও বহন করছে বা করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আর নিজেদের শিল্পের কাঁচামাল অর্থাৎ পুরোনো জাহাজ এভাবে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার দেশগুলোতে গড়ে উঠছে জীবন ও পরিবেশবিনাশী এ জাহাজভাঙা শিল্প।
অতি উচ্চ মাত্রার তেজস্ক্রিয়তাজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো অতিসীমিত সংখ্যক কয়েকটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও এ শিল্প স্থাপনের অনুমতি নেই। অথচ এর বিপরীতে নিছক মুনাফার লোভে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নাম করে এ শিল্পকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হচ্ছে—নিয়ন্ত্রণ করা তো দূরের কথা। পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য উদ্ধৃত করে জানাই, সারাবিশ্বে এ ধরনের উচ্চ তেজস্ক্রিয়তাপূর্ণ যত পুরোনো জাহাজ আছে, তার ৩৮ শতাংশই ভাঙা হয় বাংলাদেশে এবং বর্তমানের এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকের ব্যবধানে এ ধরনের জাহাজের অন্তত ৫০ শতাংশের গ্রহীতা যদি বাংলাদেশ একাই হয়ে বসে অর্থাৎ এ দেশ যদি বিশ্বের তেজস্ক্রিয়তাপূর্ণ জাহাজসমূহের সবচেয়ে ভয়ংকর ভাগাড়ে পরিণত হয়, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ এ দেশে মানুষের জীবনের চেয়ে মুনাফার লালসা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০ এর গোড়া থেকে শুরু হওয়া জাহাজভাঙা শিল্পে তেজস্ক্রিয়তাজনিত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হলেও আজ পর্যন্ত এসব মৃত্যুর কোনো একটিরও বিচার হয়নি কিংবা আইনে বিধান থাকা সত্ত্বেও এসব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়নি। যৎসামান্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ একচেটিয়া মুনাফার অংশ থেকে নিহত-আহতদেরকে সামান্য কিছু উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে বহাল তবিয়তে একই ধারায় টিকে আছে ও সদর্পে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের করুণতম এই জাহাজভাঙা শিল্প।
এখন দেখা যাক, কী থাকছে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত ঐসব জাহাজে বা জাহাজের স্ক্র্যাপে। স্বীকৃত কারিগরি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ওইসব স্ক্র্যাপে থাকে অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফেনাইল (পিসিবি), ট্রিবিউটাইলটিন (টিবিটি) ইত্যাদির মতো অতি উচ্চ মাত্রার বিষাক্ত রাসায়নিক, যেগুলো মানবদেহে ক্যানসারসহ বিভিন্ন কঠিন শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করে থাকে। এগুলোর মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করে জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর ৬৮টি দেশে এরই মধ্যে এর ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে এশিয়ার ইরান, ইরাক, সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশও রয়েছে। বাংলাদেশেও ওশি ফাউন্ডেশনসহ কোনো কোনো পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে এর উৎপাদন, ব্যবহার ও আমদানি নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) আওতায় ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত স্থায়ী জৈব দূষণ সম্পর্কিত স্টকহোম কনভেনশন কর্তৃক পলিক্লোরিনেটেড বাইফেনাইলের উৎপাদনও সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ এ নিষিদ্ধ ঘোষিত রাসায়নিকের বিষে বাংলাদেশের মানুষ এখনো মরেই চলেছে। ট্রিবিউটাইলটিনের ব্যবহারও ২০০৩ সাল থেকে নিষিদ্ধ করেছে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)। কিন্তু বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে এর উপস্থিতি রয়েই গেছে।
পরিবেশ ও জীবনের স্বার্থে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ যেখানে তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত এ জাহাজভাঙা শিল্প থেকে পরিপূর্ণভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে; সেখানে পাকিস্তান, ভারত ও তুরস্কের সৃ্গে মিলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশ এ শিল্পকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে (পৃথিবীর ৮০ শতাংশ জাহাজভাঙা শিল্প এই চার দেশে)। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে এই যে, জীবন ও পরিবেশের কথা ভেবে এ শিল্পকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হলেও সরকার উল্টো তাদের আরো পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে।
অন্যান্য প্রাণী, গাছপালা ও পরিবেশের ওপরও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা হয়তো উপলব্ধি ও দূরদর্শিতার অভাবে সাধারণ মানুষ কিংবা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক কারোরই চোখে পড়ছে না। এই চোখে না পড়ার কারণে একসময় তা এতাই ভয়ংকর আকার ধারণ করতে পারে যে, তখন হয়তো সেটি মোকাবেলার সামর্থ্য বা পরিস্থিতি কোনোটিই আমাদের আয়ত্তের মধ্যে থাকবে না। সন্দেহ নেই যে, জাহাজভাঙা শিল্পের তেজস্ক্রিয়তার সর্বাধিক প্রভাব এর শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপরই পড়ছে সর্বাগ্রে। তবে এর পর পরই এর সর্বোচ্চ প্রভাব যেয়ে পড়ছে সীতাকুণ্ডের আশপাশের মানববসতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। এমতাবস্থায় সে এলাকার জনগণ, প্রাণীকুল ও পরিবেশকে উল্লেখিত তেজস্ক্রিয়তার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এখনই জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক ও প্রতিকারধর্মী ব্যবস্থা নেয়া না হলে সেখানকার পরিস্থিতি অচিরেই ভয়ংকর ও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য স্থানে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন তেজস্ক্রিয়তার ঘটনা বিশ্লেষণ করে তাই এ ক্ষেত্রে এরূপ ভবিষ্যদ্বাণী করাই যায় যে, আগামী ২০-২৫ বছরের মধ্যে ওই অঞ্চলের জনগণের মধ্যে ব্যাপক হারে তেজস্ক্রিয়তাজনিত নানা জটিল রোগব্যাধি দেখা দিতে পারে। হিরোশিমা-নাগাসাকি (জাপান), চেরনোবিল (রাশিয়া) ও ভোপালের (ভারত) মায়েরা যেমন এখনো বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দেয়, সীতাকুণ্ড ও তৎসংলগ্ন এলাকার মায়েদের মধ্যে নিকট ভবিষ্যতে তদ্রূপ লক্ষণ দেখা দিলে তাতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অথচ এ বিশাল স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকি মোকাবেলায় রাষ্ট্রের দিক থেকে তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগই চোখে পড়ছে না।
জাহাজভাঙা শিল্পের হাত থেকে পরিবেশ, জীবন ও জনস্বাস্থ্যকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ৬(ঘ) অনুচ্ছেদে প্রাসঙ্গিক বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও শুধুমাত্র জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য সরকার ২০১৮ সালে ‘বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন’ নামে একটি নতুন আইন এবং ‘বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড’ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। বিশেষজ্ঞ অভিমত অনুযায়ী, সব শিল্পের পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের হাতে রেখে শুধুমাত্র জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ মোটেও যুক্তিযুক্ত ছিল না; বরং এটি ছিল ঐসব শিল্প কর্তৃক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকাণ্ডসমূহকে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার শামিল। আর আইন প্রণয়ন ও বোর্ড গঠন-উত্তর সময়ে এর প্রমাণও পাওয়া গেছে।
তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, জাহাজভাঙা শিল্প একটি অতি উচ্চ তেজস্ক্রিয়তাপূর্ণ শিল্প হওয়ার কারণে কারিগরি বিশেষজ্ঞতাসম্পন্ন লোকবল দিয়ে কাজকর্ম দেখভাল করার জন্য বোর্ড গঠন করা হয়েছে, তাহলেও এর গঠনকাঠামো দেখে উক্ত বক্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। মোট ১৪ সদস্যের বোর্ডে একজনও কারিগরি বিশেষজ্ঞ নেই এবং ৩ জন উদ্যোক্তা-প্রতিনিধি ছাড়া বাকি ১১ সদস্যই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের আমলা-প্রতিনিধি। তদুপরি বোর্ডের মেয়াদ হচ্ছে ৩ বছর, অর্থাৎ এটি একটি অস্থায়ী বোর্ড। অধিকন্তু এটিও লক্ষণীয় যে, তিন উদ্যোক্তা-সদস্যের ২ জন আবার সরকার মনোনীত প্রতিনিধি, অর্থাৎ তারা হচ্ছেন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিযুক্ত সদস্য। এমন একটি বোর্ডের পক্ষে অতি উচ্চ তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত স্ক্র্যাপভিত্তিক জাহাজ শিল্পকে জীবন ও পরিবেশের ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখা কি আদৌ সম্ভব? মোটেও না। সম্ভব নয় বলেই এ শিল্পে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে এবং তেজস্ক্রিয়তা বিস্তারের পাশাপাশি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে এর অন্য নানাবিধ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও।
১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত দেশে বিভিন্ন সময়ে (১৯৭২, ১৯৭৮, ১৯৮১ ও ১৯৮৬ সালে) প্রণীত শিল্পনীতিতে পরিবেশের স্বার্থে আমদানিকৃত বর্জ্য বা স্ক্র্যাপভিত্তিক শিল্প, পলিথিন ও পলিপ্রপিলিন শিল্প ইত্যাদি ছিল ‘নিষিদ্ধ তালিকা’র আওতাধীন। ১৯৯১ সালের শিল্পনীতির খসড়াতেও তেমনটিই প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে যেয়ে সেটি চূড়ান্ত হওয়ার সময় অজ্ঞাত কারণে উক্ত নিষিদ্ধ তালিকা বিলুপ্ত হয়ে যায়। সেই যে তা বিলুপ্ত হলো, নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অনেকগুলো নতুন শিল্পনীতি প্রণীত হওয়ার পরও উচ্চ তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত আমদানিকৃত বর্জ্য ও স্ক্র্যাপভিত্তিক শিল্প অর্থাৎ জাহাজভাঙা শিল্পকে আর ঠেকানো গেল না। কিছুদিন পর পর সেখানে একেকটি দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথে এসব নিয়ে খানিকটা শোরগোল হয় বটে। কিন্তু অতি অল্পদিনের মধ্যেই তা আবার থিতিয়েও যায় এবং যথারীতি ঐ জাহাজভাঙা শিল্প আগের মতোই কারখানা বা ইয়ার্ডের পাশাপাশি দেশজুড়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর কাজটি একই ধারায় বা তার চেয়েও অধিক গতিতে অব্যাহত রাখবে। আর রাষ্ট্রীয় প্রচারের পরিভাষায় তাদের ওই কর্মকাণ্ডের নাম হবে প্রবৃদ্ধি, কিন্তু জীবনের পরিভাষায় আসলেই যা হবে তেজস্ক্রিয়তা নামক নীরব ঘাতকের কাছে একটি অসহায় জনগোষ্ঠীর নিরুপায় আত্মসমর্পণ। এখন প্রশ্ন, রাষ্ট্র কি পারে না তেজস্ক্রিয়তার এ নীরব ধ্বংসের হাত থেকে তার মানুষকে বাঁচাতে? যদি না পারে, তাহলে এ রাষ্ট্রের সংবিধানে যে বলা আছে ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন’ (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক), সেটির কি হবে?
লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/২০.০৮.২০২৬