এশিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের ১৬ দিনের লড়াই শেষ হলো। সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের। এবারের আসরেও আধিপত্য ধরে রেখেছে চীন। টানা ১২ বারের মতো দলগত সেরা হয়েছে তারা। সেখানে বাংলাদেশের প্রাপ্তি স্রেফ একটি ব্রোঞ্জ।
তাও আবার উশুতে চতুর্থ হওয়ার সুবাদে। ৮১৫ জনের বহর নিয়ে জাপানে গিয়ে ১৬৯টি সোনা, ৮৯টি রুপা ও ৮৩টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৩৪১টি পদক জিতে দলগতভাবে সেরা হয়েছে চীন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা স্বাগতিক জাপান ৮৩টি সোনা, ৯৫টি রুপা ও ৯১টি ব্রোঞ্জসহ পেয়েছে ২৬৯টি পদক।
যুদ্ধ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা ইরানের অ্যাথলেটরাও দেশে ফিরেছেন ১৯টি সোনা, ১৮টি রুপা ও ১৫টি ব্রোঞ্জ নিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতই কেবল পদক তালিকার সেরা পাঁচে জায়গা করে নিয়েছে। তারা জিতেছে ২১টি সোনা, ২৭টি রুপা ও ৩৭টি ব্রোঞ্জ। শ্রীলঙ্কা পেয়েছে একটি করে সোনা, রুপা ও ব্রোঞ্জ। পাকিস্তানের ঝুলিতে দুইটি রুপা ও আটটি ব্রোঞ্জ। নেপাল পেয়েছে দুটি ব্রোঞ্জ। সেখানে বাংলাদেশের প্রাপ্তি একটি ব্রোঞ্জ।
বাংলাদেশের বহরও অবশ্য ছোট ছিল না। নারী-পুরুষ মিলিয়ে অ্যাথলেটের সংখ্যা ছিল ১৮৭ জন। তাদের মধ্যে জিন্নাত আক্তারের ব্রোঞ্জ জয়ের সুবাদে ১৯৮৬ সালের আসরে বক্সার মোশাররফ হোসেনের ব্রোঞ্জ জয়ের পর ব্যক্তিগত ইভেন্ট থেকে দ্বিতীয় পদক পেল বাংলাদেশ।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পদক জিতেছে ক্রিকেট থেকে—একটি সোনা, দুটি রুপা ও তিনটি ব্রোঞ্জ। এবারও ক্রিকেট নিয়ে প্রত্যাশা ছিল বেশি। কিন্তু নারী ও পুরুষ—দুই বিভাগেই হতাশ হতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
মেয়েদের বিভাগে ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে হারের পর ব্রোঞ্জ নির্ধারণী ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে হেরে যান নিগার সুলতানা-নাহিদা আক্তাররা। ছেলেদের বিভাগে বৃষ্টিতে ম্যাচ ভেসে যাওয়ায় মালয়েশিয়ার বিপক্ষে খেলা হয়নি বাংলাদেশের। তবে সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে ধরাশায়ী হয় লিটনরা। এরপর ব্রোঞ্জ নির্ধারণী ম্যাচে শ্রীলঙ্কার দেওয়া ১৬৫ রানও তাড়া করতে পারেনি দল।
কাবাডি থেকে অতীতে পাওয়া সাত পদকের তালিকাতেও এবার কোনো পরিবর্তন আসেনি। মেয়েদের বিভাগে তিন ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে ৪২-২২ পয়েন্টের জয়ই বাংলাদেশের একমাত্র প্রাপ্তি। ভারত ও ইরানের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় দল। ছেলেদের বিভাগে অবশ্য কিছুটা দুর্ভাগ্য সঙ্গী হয়েছে বাংলাদেশের। চার ম্যাচে দুই জয়ে চাইনিজ তাইপে ও জাপানের সমান চার পয়েন্ট পেলেও হিসাবের মারপ্যাঁচে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ঘণ্টা বাজে মিজানুর-রোমানদের।
শুটিং ও আর্চারির মতো ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশের সবসময়ই সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কারাতে খেলোয়াড় হুমায়রা আক্তার অন্তরার সঙ্গে দেশের পতাকা বহন করা শুটার আব্দুল্লাহ হেল বাকি পদকের লড়াইয়ে উঠতে পারেননি।
আলিফ-বন্যরাও আর্চারিতে পদকের লড়াইয়ে ওঠার আশা জাগাতে পারেননি। সাঁতারেও একই পরিণতি হয়েছে। হকিতে ২০১৮ সালের আসরে ষষ্ঠ হওয়াই বাংলাদেশের সেরা সাফল্য হয়ে থাকল। এবার জিমি-আশরাফুলদের হাত ধরে দল শেষ করেছে সপ্তম হয়ে।
অবশ্য গত আসরের তুলনায় এক ধাপ উন্নতির তুষ্টি আছে বাংলাদেশ দলের। প্রথমবার উইমেন’স হকিতে অংশ নেওয়া আইরিন-রিয়ারা আসর শেষ করেছেন নবম হয়ে।
নারী ফুটবলেও মেলেনি কোনো সাফল্য। সবশেষ উইমেন’স এশিয়ান কাপে খেলার অভিজ্ঞতা থাকায় পিটার জেমস বাটলারের দলকে নিয়ে প্রত্যাশা কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র-ই একমাত্র পাওয়া।
গ্রুপের বাকি দুই ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ১০-০ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৬-০ গোলে হার সঙ্গী হয় ঋতুপর্ণাদের। নিজেদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হারের বিব্রতকর অভিজ্ঞতাও হয় উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে।
ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা এবং সেখানে অনুশীলন করায় অ্যাথলেটিকসে ইমরানুর রহমানকে নিয়ে কিছুটা হলেও আশা ছিল। কিন্তু তা পূরণ হয়নি। সেমিফাইনাল থেকেই ছিটকে যান বাংলাদেশের দ্রুততম মানব।
মোট ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের কেউ বক্সিং, ভারোত্তোলন, জিমন্যাস্টিকস, কারাতে, ফেন্সিং, সাইক্লিং, ব্যাডমিন্টন, গলফ, জুডো, টেবিল টেনিস, বিচ ভলিবল ও রেসলিংসহ কোনো ইভেন্টেই বড় কোনো চমক দেখাতে পারেননি। সব মিলিয়ে এবারও ‘অংশগ্রহণই মূল কথা’—এই বৃত্তেই আটকে থাকল বাংলাদেশের এশিয়ান গেমস অভিযান।
ডিসি/আপ্র/৪/১০/২০২৬