রাজীব নন্দী
বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম আমার রোজকার খবরের অন্যতম প্রধান উৎস। শুরু থেকেই এই সংবাদমাধ্যমটি আমাকে কখনো হতাশ করেনি। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মাত্র ৫৯ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন- ২ অক্টোবর ২০২৬ খবরটি মেনে নিতে হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে বসে।
২০০৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ই সাংবাদিকতার চর্চা শুরু করি। পরের বছর একটি জাতীয় দৈনিকের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে পাকাপাকিভাবে সাংবাদিকতায় যুক্ত হই। তখন হয়তো বুঝিনি। কিন্তু আজ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়- আমি নীরবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক ঐতিহাসিক বাঁকবদলের সাক্ষী হয়ে উঠছিলাম।
কাগজের সাংবাদিকতার ওই দিনগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছি, খবরের প্রধান উৎসগুলোর একটি হয়ে উঠছে অনলাইন সংবাদ সংস্থা বিডিনিউজ। সকালে হাতে আসা সংবাদপত্রের পাশাপাশি নিউজরুমে দ্রুত তথ্যের জন্য তাকানো হচ্ছে অনলাইনের দিকে। সংবাদ আসছে মুহূর্তে। বদলে যাচ্ছে খবর সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের গতি। আরও পরে বুঝেছি, পরিবর্তনটি শুধু সংবাদমাধ্যমের প্রযুক্তিগত রূপান্তর ছিল না। এটি আমার মতো এক প্রজন্মের সাংবাদিকের পরিচয়ও বদলে দিয়েছিল। অফলাইন থেকে অনলাইনে সাংবাদিকতার সেই উত্তরণের মধ্য দিয়েই যেন আমি একজন সিটিজেন থেকে নেটিজেন হয়ে উঠছিলাম। আর সেই রূপান্তরের নীরব সাক্ষী হয়ে আমার স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে তৌফিক ইমরোজ খালিদী ও বিডিনিউজের নাম।
বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল অধ্যায় যেন থেমে গেল ২ অক্টোবর ২০২৬। চৌকস সংবাদ ব্যক্তিত্ব, নির্মেদ সংবাদ সম্পাদনার কারিগর, নির্মোহ সাংবাদিকতার এক শক্তিমান মুখ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক হিসেবে তিনি শুধু একটি সংবাদমাধ্যম পরিচালনা করেননি; বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার ভাষা, গতি ও পেশাদার মান নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
আক্ষরিক অর্থেই তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ‘টার্নিং পয়েন্টস’। এটি একটি তার সু-সম্পাদিত ম্যাগাজিনের নাম নয়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি বড় বাঁকবদলের কথাও এটি মনে করিয়ে দেয়- যে সময়ে সংবাদপত্রের কাগজের পাতা থেকে সংবাদ ক্রমশ চলে আসছিল ইন্টারনেটের পর্দায়।
২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশে যখন অনলাইন সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, তখন খালিদী ভাই ছিলেন ওই পরিবর্তনের অগ্রভাগের একজন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, সংবাদ শুধু পরদিন সকালে পাঠকের হাতে পৌঁছাবে না। সংবাদ পৌঁছাতে পারে মুহূর্তে। দেশ-বিদেশের তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে, দ্রুত এবং ধারাবাহিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এ রূপান্তরটি ছিল কেবল প্রযুক্তিগত নয়। এটি ছিল সাংবাদিকতার সংস্কৃতিরও পরিবর্তন। সংবাদ সংগ্রহের গতি বদলেছে। সম্পাদনার কাঠামো বদলেছে। পাঠকের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক বদলেছে। সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস বদলেছে। ধীরে ধীরে বদলে গেছে বাংলাদেশের পুরো গণমাধ্যম-ইকোসিস্টেম। সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রাথমিক উদ্যোক্তা ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। এমন একজন তরতাজা, প্রাণবান মানুষের হঠাৎ চলে যাওয়া তাই ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্যও একটি গভীর ক্ষতি। খুব অল্প বয়সে তার চলে যাওয়াটা মেনে নেওয়া কঠিন। খুব কঠিন।
সাংবাদিকতার রাজনৈতিক অর্থনীতি আমাদের শেখায়, সংবাদমাধ্যম কখনোই ক্ষমতার বাইরে কোনো নির্বিষ দ্বীপ নয়। রাষ্ট্র, বাজার, মালিকানা, বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জনস্বার্থের টানাপড়েনের মধ্যেই সাংবাদিকতার প্রতিদিনের লড়াই। ওই লড়াইয়ে খালিদী ভাই ছিলেন সাংবাদিকতার গোত্রের মানুষ। তিনি জানতেন, সংবাদমাধ্যমের আসল শক্তি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা নয়। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার স্বাধীনতায়। এ জায়গাটিই তার সাংবাদিকতা-দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি। প্রতিকূলতা ছিল। চাপ ছিল। মামলা ছিল। নানা ধরনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা ছিল। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত নীতির প্রশ্নে তিনি নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাই তার সাংবাদিকতার উত্তরাধিকার শুধু বিডিনিউজ২৪-এর ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ডিজিটাল রূপান্তরের ইতিহাসেরও অংশ। আর সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো টার্নিং পয়েন্টস- যেখানে বাংলাদেশের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম বৈশ্বিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সঙ্গে কাজ করে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সাংবাদিকতার এক নতুন সংযোগ তৈরি করেছিল।
২০০৫-০৬ সালের দিকে বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু করার অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। তার হাত ধরেই অনলাইনে দেশ-বিদেশের খবর মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে দেশের প্রায় সব সংবাদপত্রই অনলাইন সংস্করণ চালু করে। তাই বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ডিজিটাল রূপান্তরের ইতিহাসে তার অবদান সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। পেশাগত জীবনে নানা প্রতিকূলতা ও চাপের মধ্যেও তিনি সাংবাদিকতার নীতি ও স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করেননি- এমনটাই আমরা দেখে এসেছি। মেরুদণ্ড সোজা রেখে সাংবাদিকতা করার মতো মানুষ আমাদের দেশে সত্যিই খুব কম। মামলা, চাপ কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতি- কোনোটিই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি। বারবার ফিরে এসে তিনি সংবাদমাধ্যমের প্রতি এবং দেশের মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা পালন করে গেছেন।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতা-দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে যুক্ত করা। তার নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে ঞযব ঘবি ণড়ৎশ ঞরসবং ঘবংি ঝবৎারপব ধহফ ঝুহফরপধঃব-এর যে অংশীদারিত্ব তৈরি হয়েছিল, তার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ ছিল বার্ষিক ম্যাগাজিন ঞঁৎহরহম চড়রহঃং। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে এই অংশীদারিত্বের ঘোষণা আসে। বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারনেট-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি হিসেবে বিডিনিউজের জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক নতুন পদক্ষেপ। একই সঙ্গে এটি ছিল আন্তর্জাতিক কনটেন্ট-সিন্ডিকেশন এবং স্থানীয় সাংবাদিকতার একটি বিশেষ সমন্বয়।
বিশ্ব সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপটে ঞঁৎহরহম চড়রহঃং নিজেই ছিল একটি বিশেষ ধরনের প্রকাশনা। এটি ছিল ঞযব ঘবি ণড়ৎশ ঞরসবং ঘবংি ঝবৎারপব ধহফ ঝুহফরপধঃব-এর লাইসেন্সপ্রাপ্ত বার্ষিক ম্যাগাজিন। এর লক্ষ্য ছিল আগের বছরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করে পরবর্তী বছরের সম্ভাব্য বৈশ্বিক এজেন্ডা নিয়ে পাঠককে ভাবতে সাহায্য করা। সমসাময়িক তথ্য অনুযায়ী, তখন এটি ২৪টি দেশে ১২টি ভাষায় প্রকাশিত হতো। এখানেই বাংলাদেশের উদ্যোগটির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তৈরি হয়। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস কেবল একটি বিদেশি সংবাদপত্রের কনটেন্ট বাংলাদেশে পুনর্মুদ্রণের জন্য বিডিনিউজকে বেছে নেয়নি। স্থানীয় সাংবাদিকতা, সাক্ষাৎকার, বিশ্লেষণ ও বিশেষ ফিচারের সঙ্গে তাদের আন্তর্জাতিক কনটেন্টকে একই প্রকাশনায় যুক্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ এটি ছিল কনটেন্ট আমদানির পাশাপাশি স্থানীয় কনটেন্টকে একটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ।
বিডিনিউজের জন্য এর আরেকটি ঐতিহাসিক দিক ছিল প্রযুক্তিগত। বিডিনিউজ তখন নিজেকে ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ঞঁৎহরহম চড়রহঃং ছিল তাদের প্রথম বড় মুদ্রিত ম্যাগাজিন প্রকাশনার অভিজ্ঞতা। ফলে ডিজিটাল সাংবাদিকতার একটি প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে প্রিন্ট, ডিজিটাল এবং ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা নিয়ে কাজ করে। ২০১৬ সালের ঞঁৎহরহম চড়রহঃং: অমবহফধ ভড়ৎ ২০১৬ সংখ্যায় আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় কনটেন্টের একটি পরিকল্পিত মিশ্রণ দেখা যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ, আঞ্চলিক সম্পর্ক, উগ্রবাদ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের মতো বিষয় সেখানে স্থান পেয়েছিল। এ মডেলটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার বড় একটি সমস্যা হলো স্থানীয় বাস্তবতাকে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা।
ঞঁৎহরহম চড়রহঃং-এর বাংলাদেশ সংস্করণে ওই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। নিউইয়র্ক থেকে আসা বৈশ্বিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, অধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বক্তব্য যুক্ত করা হয়েছিল। এখানে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি শুধু বিডিনিউজের সম্পাদক হিসেবে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ সংস্করণের প্রকাশক এবং সম্পাদনা ও কনটেন্ট-দিকনির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ম্যাগাজিনটি বাংলাদেশের আগের বছরের বাস্তবতাকে পর্যালোচনা করার পাশাপাশি পরবর্তী বছরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পাঠককে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যম আন্তর্জাতিক সংবাদ-শিল্পের একটি প্রতিষ্ঠিত সিন্ডিকেশন কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। ঞযব ঘবি ণড়ৎশ ঞরসবং ঘবংি ঝবৎারপব ধহফ ঝুহফরপধঃব ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন দেশের প্রকাশনার সঙ্গে কনটেন্ট, লাইসেন্স এবং বহুমাধ্যমভিত্তিক প্রকাশনা নিয়ে কাজ করেছে। ম্যাগাজিনটি ছিল সেই বৈশ্বিক মডেলেরই একটি উদাহরণ।
সমসাময়িক বিডিনিউজ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ম্যাগাজিনটি ২৪টি দেশে প্রকাশিত হতো এবং প্রতিটি দেশে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস স্থানীয় অংশীদার নির্বাচন করত। তৌফিক ইমরোজ খালিদী তখন উল্লেখ করেছিলেন যে বাংলাদেশে এই অংশীদারিত্বের জন্য বিডিনিউজকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে এর গুরুত্ব এখানেই। এটি দেখিয়েছিল যে, বাংলাদেশের একটি দেশীয় সংবাদমাধ্যম কেবল আন্তর্জাতিক সংবাদ গ্রহণকারী হতে হবে না। প্রয়োজন হলে সেটি আন্তর্জাতিক সংবাদ-প্রকাশনা ব্যবস্থার অংশীদারও হতে পারে। এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার আত্মবিশ্বাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক সংবাদপ্রবাহে বাংলাদেশ মূলত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একটি কভারেজ এলাকা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। ম্যাগাজিনটির মডেলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম নিজেই আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার একটি প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার অবস্থানে যায়। এর আরেকটি তাৎপর্য ছিল স্থানীয় সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিকীকরণ।
বাংলাদেশের নিজস্ব সাংবাদিকতা, গবেষণা ও মতামতকে আন্তর্জাতিক কনটেন্টের পাশে একই সম্পাদিত প্রকাশনায় রাখা হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কেবল স্থানীয় পাঠকের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেগুলো একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক পাঠ পরিসরের অংশ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এখানে ‘মাল্টিমিডিয়া’ দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালের অংশীদারিত্ব ঘোষণাতেই বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের শীর্ষ সংবাদ নির্মাতাদের নিয়ে বিশেষ সাক্ষাৎকার অনলাইন ও প্রিন্ট- দু’মাধ্যমেই উপস্থাপিত হবে। অর্থাৎ এটি কেবল একটি ম্যাগাজিন ছিল না; ছিল একই কনটেন্টকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারের একটি সমন্বিত সাংবাদিকতা মডেল।
২০১৬ সালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনেও ম্যাগাজিনটির প্রিন্ট, ডিজিটাল ও ভার্চুয়াল সংস্করণের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এই সমন্বয়টি সে সময় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের জন্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ তখনো অধিকাংশ ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম মূলত প্রিন্ট-কেন্দ্রিক কাঠামো থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাই বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বিবর্তনের দিকে তাকালে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর এই উদ্যোগকে শুধু একটি বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি ছিল একটি মিডিয়া-ইনোভেশন। একই সঙ্গে এটি ছিল আন্তর্জাতিক কনটেন্ট সহযোগিতা, ডিজিটাল-টু-প্রিন্ট ট্রানজিশন, মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা এবং স্থানীয় সাংবাদিকতার বৈশ্বিকীকরণ- এ চারটি প্রবণতার মিলনস্থল।
২০১৬ সালে প্রকাশিত প্রথম বাংলাদেশ সংস্করণের ১৪৬ পৃষ্ঠায় বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। উগ্রবাদ, গণতন্ত্র, ইতিহাস, আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের মতো বিষয় সেখানে জায়গা পেয়েছিল। সমসাময়িক প্রতিবেদনে এটি বাংলাদেশের মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপে একটি ‘প্রধান মাইলফলক’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী বছরেও উদ্যোগটি অব্যাহত ছিল। ২০১৭ সালের সংস্করণেও দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সিন্ডিকেট কনটেন্টের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, উদ্ভাবন ও তরুণ প্রজন্ম নিয়ে স্থানীয় বিশ্লেষণ যুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ এটি একবারের কোনো প্রতীকী উদ্যোগ ছিল না। এটি অন্তত কয়েক বছর ধরে চলা একটি বাস্তব সম্পাদকীয় ও প্রকাশনা সহযোগিতায় পরিণত হয়েছিল।
বিশ্ব সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপটে ঞঁৎহরহম চড়রহঃং ছিল তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতা-উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অনলাইন সাংবাদিকতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবাদকে ডিজিটাল পরিসরে নিয়ে আসার পর তিনি সেই সাংবাদিকতাকে আন্তর্জাতিক কনটেন্ট, প্রিন্ট প্রকাশনা ও বৈশ্বিক মিডিয়া-নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাই এটি শুধু একটি ম্যাগাজিন নয়; স্থানীয় সাংবাদিকতার বৈশ্বিক সংযোগের একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ। আর এই বাঁকবদলের সঙ্গে খালিদী ভাইয়ের নাম অবিচ্ছেদ্য।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী নিজেই ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক টার্নিং পয়েন্ট- একটি বাঁক, যা সংবাদ আর শুধু কাগজের পাতায় আটকে থাকেনি; চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়, পর্দায়, মুহূর্তের গতিতে। তিনি কখনো ক্ষমতাসীন ছিলেন না। তাই তাকে কেউ ক্ষমতাহীনও করতে পারেনি। তার চলে যাওয়া একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু তার রেখে যাওয়া বাঁকটি থেকে যাবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার পথরেখায়।
শ্রদ্ধা। ভালোবাসা। বিদায়, খালিদী ভাই।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬