বাংলাদেশে হাম এখন আর কেবল একটি সংক্রামক রোগের নাম নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীরে থাকা একাধিক দুর্বলতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়া হাম আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রায় অপুষ্টিতে ভুগছিল-এই তথ্য আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের। এর মধ্যে ১২ শতাংশ ছিল তীব্র অপুষ্টির শিকার, আর ৫৩ শতাংশের ছিল মাঝারি অপুষ্টি। আরো ভয়াবহ হলো, আক্রান্ত শিশুদের ৩৮ শতাংশ জন্মের পর পর্যাপ্ত মায়ের দুধ পায়নি। হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশে। অর্থাৎ হাম শুধু সংক্রমণের সংকট নয়, এটি শিশুর পুষ্টি, প্রতিরোধক্ষমতা এবং টিকাসুরক্ষার সম্মিলিত সংকট।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আইসিডিডিআর,বির গবেষকদের ৩৫৪ শিশুর ওপর পরিচালিত গবেষণায় ১১ জনের মৃত্যু এবং ১৮ জনের নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। যদিও ৩৪৩ শিশু চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে, মৃত্যুর এই সংখ্যা আমাদের আত্মতুষ্টির সুযোগ দেয় না। কারণ একটি শিশুর হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুও প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রশ্ন তোলে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা টিকাকেন্দ্রিক। টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি এমন নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও বিপুলসংখ্যক হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আবার টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের হার অত্যন্ত বেশি। এক ডোজ কিংবা সুপারিশকৃত দুই ডোজ নেওয়া কিছু শিশুও আক্রান্ত হয়েছে। গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, টিকা নেওয়ার পর পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি বা ব্যক্তিভেদে অন্য কোনো কারণ এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গবেষণাটি এসব কারণের কোনটি কতটা দায়ী, তা নির্ধারণের জন্য পরিচালিত হয়নি।
এই সতর্কতাকে নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। শুধু টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; টিকা সময়মতো শিশুর কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, কোনো শিশু বাদ পড়ছে কি না, টিকার দুই ডোজের পূর্ণ সুরক্ষা কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি কোথায়-এসব প্রশ্নের ধারাবাহিক নজরদারি জরুরি।
বিশেষ করে অপুষ্টি মোকাবিলাকে হামের প্রতিরোধনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। জন্মের পর মায়ের দুধ নিশ্চিত করা, শিশুর পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, অপুষ্ট শিশুকে দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা ও পুষ্টিসেবা দেওয়া এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সামাজিক সহায়তার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। কারণ দুর্বল শরীরের ওপর হাম তার ভয়াবহতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
দেশে বর্তমানে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গের রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭১১-বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে দেশে বি৩ ধরনের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার তথ্যও নজরদারি জোরদারের দাবি জানায়। আশার বিষয়, গবেষকেরা জানিয়েছেন, শনাক্ত মিউটেশনগুলো ভাইরাসের তীব্রতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেনি এবং প্রচলিত হাম টিকাই এ ধরনের বিরুদ্ধেও কার্যকর থাকবে।
সুতরাং এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ। টিকাদান, পুষ্টি, মাতৃদুগ্ধ, রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি এবং দ্রুত চিকিৎসাকে একই জনস্বাস্থ্য কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। হাম প্রতিরোধে সাময়িক কর্মসূচি নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। একটি শিশুর মৃত্যু যেন আর অপুষ্টি, টিকাবঞ্চনা ও অব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতীক না হয়-এটাই হওয়া উচিত এখনকার সবচেয়ে জরুরি জাতীয় প্রত্যয়।
সানা/আপ্র/২২/৮/২০২৬