‘এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’ শৈশবে পড়া এই পঙ্ক্তির প্রকৃত তাৎপর্য অনেক সময় একটি মানুষের মৃত্যুর পরই গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। কারণ মানুষের জীবন কেবল তার নিজের জন্য নয়; কোনো কোনো মানুষের জীবন হয়ে ওঠে পরিবার, সমাজ ও একটি জনপদের জন্য দীর্ঘ এক আলোকবর্তিকা। তাঁদের চলে যাওয়া তাই কেবল একটি পরিবারের শোক নয়, একটি সময়ের অবসান, একটি মানবিক উত্তরাধিকারের সামনে নতুন করে দাঁড়ানোর মুহূর্ত।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লস্কর গ্রামের চিকিৎসক মো. মনসুর আলী গাজীর জীবন তেমনই এক অনন্য উত্তরাধিকার। গত ২৮ সেপ্টেম্বর সোমবার সকাল ৯টা ৩৪ মিনিটে তাঁর দুনিয়ার সফর শেষ হয়েছে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া জীবনদর্শন, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, পেশাগত সততা এবং আট সন্তানের অসাধারণ শিক্ষাগত ও পেশাগত সাফল্য তাঁকে তাঁর মৃত্যুর পরও বাঁচিয়ে রাখবে। তাঁর জীবনকে কেবল একজন গ্রামীণ চিকিৎসকের জীবন বলে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা যাবে না। এটি একই সঙ্গে মানবসেবা, আত্মমর্যাদা, পারিবারিক শৃঙ্খলা, শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকার এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নীরব সংগ্রামের ইতিহাস।
লস্কর গ্রাম আজকের মতো ছিল না। একসময় এটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ, দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এক জনপদ। উপজেলা সদরের থানা ছিল প্রায় চার কিলোমিটার দূরে। মাঝখানে নদী, কাদামাটির পথ, নৌকা ও পায়ে হাঁটার কষ্ট। গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে দুই হাজার সালের পর। এমন এক পরিবেশেই ১৯৬২ সালে মনসুর আলী গাজীর সংসারে বধূ হয়ে আসেন মাজেদা খানম ডালিম। পাইকগাছা পৌরসভার বান্দিকাটী এলাকার সম্ভ্রান্ত সরদার পরিবারের মেয়ে ডালিমের বাবা ছিলেন গ্রামের চিকিৎসক মফিজ উদ্দিন সরদার। বান্দিকাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর দাদির প্রবল আপত্তিতে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন থেমে যায়।
কিন্তু পড়াশোনা থেমে গেলেও শিক্ষার প্রতি তাঁর আকর্ষণ থামেনি। বরং নিজের অপূর্ণ শিক্ষাজীবনের আক্ষেপ থেকেই তিনি যেন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাঁর সন্তানদের শিক্ষার পথ কখনো বন্ধ হতে দেবেন না। বিয়ের পর মনে মনে স্থির করেছিলেন, সন্তানদের অন্তত স্নাতক পর্যন্ত পড়াবেন। পরবর্তী জীবনে সেই সংকল্পই রূপ নেয় এক অসাধারণ পারিবারিক সাফল্যের ইতিহাসে।
মনসুর আলী গাজীর জীবনও ছিল সিদ্ধান্ত ও ত্যাগের। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী এই তরুণ ১৯৫৬ সালে পাইকগাছা হাই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করে যশোর ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন। চার বছর পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৬০ সালে ন্যাশনাল মেডিকেল প্র্যাকটিশনার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরি লাভ করেন। কর্মস্থল নির্ধারিত হয় চাঁদখালী সরকারি চ্যারিটেবল ডিসপেনসারিতে।
কিন্তু চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগের দিনই গ্রামের একটি ছোট মহামারি তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। অসহায় মানুষ চিকিৎসার জন্য তাঁর বাড়িতে ছুটে আসে। তাঁর বাবা মো. জাফর আলী গাজী তখন সরকারি চাকরিতে না গিয়ে গ্রামের মানুষের সেবা করার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশই হয়ে ওঠে মনসুর আলী গাজীর আজীবনের ব্রত।
লস্কর ও সোলাদানা ইউনিয়নের রাস্তাবিহীন, জলমগ্ন ও কর্দমাক্ত দুর্গম এলাকায় তিনি চিকিৎসাসেবা দিতে শুরু করেন। রোগীর বাড়িতে কখনো সাইকেলে, কখনো নৌকায়, কখনো হেঁটে যেতে হয়েছে তাঁকে। তখন ফোন ছিল না। দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন। তাঁদের জন্য বাড়ির দরজা খোলা থাকতো। দুপুরের খাবার, গোসল কিংবা সামান্য বিশ্রামের ব্যবস্থাও করা হতো। রোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী যা দিতেন, তাই গ্রহণ করতেন তিনি; কারো কাছে দাবি করে অর্থ নিতেন না। চিকিৎসা তাঁর কাছে কেবল জীবিকা ছিল না, ছিল মানুষের পাশে থাকার নৈতিক দায়িত্ব।
এই চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেক দীর্ঘ সংগ্রাম। ১৯৬০ সালে চার বছরের চিকিৎসা কোর্স ও ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করার পর ১৯৬১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার কোর্সটি বন্ধ করে দেয় এবং শেষ দিকের শিক্ষার্থীদের আরো এক বছর পড়ার মাধ্যমে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ দেয়। কিন্তু গ্রামের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা ছেড়ে সেই সুযোগ নিতে পারেননি মনসুর আলী। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সরকার ওই কোর্সের শেষ দুটি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা করার জন্য নিবন্ধন নম্বর দেয়নি।
অধিকার আদায়ে তিনি মামলা করেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সেই আইনি লড়াই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে চালিয়ে যান। একপর্যায়ে ভাষাসৈনিক গাজীউল হককে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ করেন। দীর্ঘ ১৯ বছরের আইনি লড়াই শেষে ১৯৮০ সালে তিনি মামলায় জয়ী হন এবং চিকিৎসা করার জন্য নিবন্ধন নম্বর লাভ করেন-১২৯৯।
আত্মমর্যাদাবোধের সেই সংগ্রামও ছিল ব্যতিক্রমী। নিবন্ধন পাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত তিনি সাদা কাগজে প্রেসক্রিপশন লিখেছেন। বিজয়ের পর ঢাকা থেকে ছাপানো প্রেসক্রিপশন প্যাড নিয়ে বাড়ি ফেরেন। তারপর থেকে ছাপানো প্যাডে প্রেসক্রিপশন লেখা শুরু করেন। এটি শুধু একটি মামলায় জয় নয়; পেশাগত অধিকার, আত্মমর্যাদা এবং মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রতি একজন চিকিৎসকের দীর্ঘ অঙ্গীকারের স্বীকৃতি।
ঢাকায় মামলা চলেছে, কিন্তু লস্কর ও সোলাদানার মানুষ যাতে চিকিৎসাবঞ্চিত না হয়, সে ব্যাপারে তাঁর দায়িত্ববোধে কোনো শৈথিল্য আসেনি। দিনের বেলায় রোগী দেখা, দুর্গম এলাকায় যাওয়া, রাতে নাইট কোচে ঢাকা যাতায়াত, আবার ফিরে এসে চিকিৎসাসেবা-এই কঠিন জীবনযাত্রার পেছনে ছিলেন তাঁর জীবনসঙ্গী মাজেদা খানম ডালিম। সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা, রোগীদের আপ্যায়ন এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে পরিবারের সব দায়িত্ব তিনি নীরবে বহন করেছেন।
মাজেদা খানম ডালিম
এই দম্পতির সংসারে জন্ম নেয় আট সন্তান। বিদ্যুৎহীন গ্রামের অন্ধকারে তাঁদের শিক্ষাজীবনের অন্যতম প্রতীক ছিল হারিকেন। প্রত্যেক সন্তানের জন্য ছিল আলাদা হারিকেন ও ছোট টেবিল-চেয়ার। মাগরিবের আজানের সঙ্গে বাড়ির প্রধান দরজা বন্ধ হয়ে যেত। খেলাধুলা ছেড়ে সন্তানদের ঘরে ফিরতে হতো। অজু, নামাজ, তারপর পড়াশোনা। সন্তানরা ভয় পেলে বাবা-মা পাশে বসে কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করতেন। অনেক সময় ভোরের আলো ফুটে ওঠা পর্যন্ত তাঁদের পাশে থাকতেন। রাত তিনটায় ঘুম থেকে তুলে আবার পড়তে বসানো ছিল সেই শৃঙ্খলারই অংশ।
সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে আত্মীয়-স্বজনের সমালোচনাও তাঁদের থামাতে পারেনি। মেয়েদের বেশি পড়াশোনা করানোর প্রয়োজন নেই-এমন ধারণা যেমন ছিল, তেমনি ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হলে সন্তানের পড়াশোনা নষ্ট হবে-এমন আশঙ্কাও ছিল। কিন্তু মনসুর আলী ও ডালিম দম্পতি তাঁদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি। ডালিমের প্রতিবাদ ছিল উচ্চকণ্ঠ নয়, কিন্তু সংকল্প ছিল দৃঢ়। বড় ছেলে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত তিনি পুরোনো বাড়িতে যাননি। বড় ছেলে এলএলএম পাস করে ঢাকার হাইকোর্টে আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার পর আবার সেখানে যাওয়া শুরু করেন। নীরব অভিমানেও তাঁর লক্ষ্য ছিল সন্তানের ভবিষ্যৎ।
আজ সেই আট সন্তান তাঁদের বাবা-মায়ের স্বপ্নের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বড় মেয়ে কোহিনুর খানম স্নাতক পাস করে জগন্নাথ কলেজে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন। পড়াশোনা শেষ করার আগেই নোয়াখালীর একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি শুরু করেন; বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত এবং ঢাকায় বসবাস করছেন। বড় ছেলে মো. মাহবুবুর রহমান আইনশাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে জাপানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। মেজো ছেলে মো. মেহেদী মাসুদ ইউক্রেন থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে তথ্যপ্রযুক্তি পেশায় যুক্ত হয়ে সাফল্য অর্জন করেছেন। সেজো ছেলে মো. মোস্তাক আহমেদ নিজগ্রাম লস্কর-করুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। মেরি খানম গণিতে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করে খুলনার একটি বেসরকারি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মো. মোস্তফা কামাল লন্ডন থেকে এলএলএম ডিগ্রি অর্জনের পর ঢাকার সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইন পেশায় নিয়োজিত। কনিষ্ঠপুত্র ডা. মেহেদী হাসান এমবিবিএস পাস করে ঢাকায় চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সবার ছোট মলি খানম ইডেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে স্বামীর সঙ্গে জাপানে বসবাস করছেন।
একটি প্রত্যন্ত গ্রামের পরিবারে আট সন্তানের এমন শিক্ষাগত ও পেশাগত সাফল্য নিঃসন্দেহে বিরল। তবে এই সাফল্য শুধু সনদ বা পেশাগত পরিচয়ের হিসাব নয়। এর পেছনে রয়েছে হারিকেনের আলো, রাত তিনটার শৃঙ্খলা, মাগরিবের আজানে ঘরে ফেরা, মায়ের রান্নাঘরের নিরন্তর শ্রম, বাবার সাইকেল ও নৌকায় রোগীর বাড়ি ছুটে যাওয়া, রাতের বাসে ঢাকা যাতায়াত এবং দীর্ঘ আইনি লড়াই। সবচেয়ে বড় কথা, এর পেছনে ছিল একটি বিশ্বাস-প্রতিকূল গ্রাম থেকেও সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায়।
মাজেদা খানম ডালিম নিজে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়তে পারেননি। কিন্তু বইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি। মোহাম্মদ হোসেনের ‘আনোয়ারা’ ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর একটি। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বেগম রোকেয়া, শওকত ওসমান, শহীদুল্লাহ কায়সার, আহমদ ছফা, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ বিভিন্ন লেখকের সাহিত্য তিনি পড়েছেন। নবীজির জীবনী, রাবেয়া বসরিসহ বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। ‘জীবন সংগ্রাম মনিসিং’ পড়ে ইলা মিত্রের নির্যাতনের কথা জেনে তিনি দীর্ঘদিন ব্যথিত ছিলেন। কাঠের বাক্সের বড় রেডিওতে খুলনা বেতার ও ঢাকা বেতারের নাটক শুনতেন; বুধবার ও শনিবারের রাতের নাটক, রোববার দুপুরের পর আকাশবাণী ও বিবিধ ভারত থেকে প্রচারিত নাটকও ছিল তাঁর বিনোদনের অংশ।
এই পাঠাভ্যাস একটি অল্পশিক্ষিত গ্রামীণ নারীর ব্যক্তিগত আগ্রহের চেয়েও বড় কিছু। এটি দেখায়, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না থাকলেও জ্ঞানপিপাসা মানুষকে কত দূর নিয়ে যেতে পারে এবং একটি মা কীভাবে বই, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের মাধ্যমে সন্তানদের সামনে একটি বৃহত্তর পৃথিবীর দরজা খুলে দিতে পারেন।
মনসুর আলী ও মাজেদা খানমের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁদের বিনয়, সংযম, সহনশীলতা ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ তাঁদের আচরণে ছিল না। তাঁরা উচ্চস্বরে কথা বলতেন না, অন্যের ব্যক্তিগত কথা প্রকাশ করতেন না এবং মানুষের বিপদে যথাসাধ্য পাশে দাঁড়াতেন। ক্ষেত-খামার কিংবা বাড়ির কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের পারিশ্রমিক দেওয়ার ক্ষেত্রেও মনসুর আলী ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল। কাজ শেষ হওয়ার আগেই টাকা ভাংতি করে হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতেন, যাতে কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করা যায়।
প্রতি ঈদে তাঁদের বাড়ি হয়ে উঠতো আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের মিলনস্থল। সেমাই, মুরগি, খাসি, গরুর মাংসসহ নানা পদের খাবারে সবার পছন্দের ব্যবস্থা থাকতো। ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকতেন ডাক্তার মনসুর আলী। ঈদের আগের দিন মাজেদা খানম নিজ হাতে রান্নাবান্না সামলাতেন। অতিথি আপ্যায়নে দুজনই থাকতেন অগ্রভাগে। তাঁদের বাড়িতে গেলে মানুষ অনুভব করতো-মানুষের পরিচয়ই সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আজ মনসুর আলী গাজী নেই। বয়সের ভারে মাজেদা খানম ডালিমও ন্যুব্জ। লাঠি ভর করে হাঁটতে হয় তাঁকে। কিন্তু তাঁর চোখে এখনো সেই সংকল্পের আলো রয়েছে। কারণ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; আট সন্তানের শিক্ষা, প্রতিষ্ঠা এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে সম্মানজনক অবস্থান।
এই জীবনকাহিনি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সত্যও তুলে ধরে। শিক্ষার জন্য সব সময় বড় অবকাঠামো প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় অটল সংকল্প। দারিদ্র্য, দুর্গমতা, বিদ্যুতের অভাব, সামাজিক আপত্তি কিংবা সীমিত সুযোগ কোনো পরিবারকে থামাতে পারে না, যদি বাবা-মা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় থাকেন। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, একটি সফল সন্তানের পেছনে শুধু একজন বাবার উপার্জন থাকে না; থাকে একজন মায়ের অদৃশ্য শ্রম, শাসন, মমতা, রাতজাগা এবং আত্মত্যাগ।
ডাক্তার মনসুর আলী গাজীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি মানুষ চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর জীবনদর্শন শেষ হয়নি। তাঁর সন্তানদের শিক্ষা ও পেশাগত সাফল্যে, তাঁদের মূল্যবোধে এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায় তিনি বেঁচে থাকবেন। মাজেদা খানম ডালিমের জীবনও সেই উত্তরাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
হারিকেনের ক্ষীণ আলোয় যে আটটি শিশু পড়তে বসেছিল, তারা আজ আটটি আলাদা জীবনে আলোর উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই আলো শুধু একটি পরিবারের ঘর আলোকিত করেনি; তা ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষকতা, চিকিৎসা, আইন, শিক্ষা, গবেষণা ও পেশাজীবনের নানা অঙ্গনে। একটি প্রত্যন্ত গ্রামের অন্ধকার থেকে যে আলো জ্বলে উঠেছিল, তার দীপ্তি আজ বহু দূরে পৌঁছেছে।
মানুষের জীবনের সার্থকতা তাই কেবল সে নিজে কতটা অর্জন করলো, তার হিসাব দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং সে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে কতটা আলো তুলে দিতে পারলো, কতজন মানুষের জীবনে কতটা মানবিকতার ছাপ রেখে যেতে পারলো-সেই উত্তরাধিকারই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
মনসুর আলী গাজী সেই অর্থে একজন পরিপূর্ণ মানুষ। আর মাজেদা খানম ডালিম সেই পরিপূর্ণতার নীরব সহযোদ্ধা। তাঁদের জীবন প্রমাণ করে-বিদ্যুৎ না থাকলেও শিক্ষা থেমে থাকে না, পথ কাদায় ডুবে গেলেও মানুষের সেবা থামে না, সুযোগ সংকুচিত হলেও স্বপ্ন ছোট হতে হয় না। একটি হারিকেনের আলোও একদিন একটি পরিবারের আটটি আলোকবর্তিকা জ্বালাতে পারে।
লস্কর গ্রামের সেই হারিকেনের আলো আজ আর একটি ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে আছে সন্তানদের জীবনে, তাঁদের কর্মে, তাঁদের পরিবারে এবং একটি জনপদের স্মৃতিতে। একজন চিকিৎসকের মৃত্যু তাই তাঁর জীবনের শেষ কথা নয়; মানুষের জন্য বেঁচে থাকা একটি জীবন মৃত্যুর পরও সমাজকে আলো দেখাতে পারে।
এটাই মনসুর আলী গাজীর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। এটাই মাজেদা খানম ডালিমের সবচেয়ে বড় অর্জন। আর এটাই একটি পরিবারের সাফল্যকে একটি জনপদের প্রেরণায় পরিণত করে; যার প্রভাবে সমাজ ও দেশও এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ পায়।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আজকের প্রত্যাশা
সানা/আপ্র/৬/১০/২০২৬