এইডস বা এইচআইভি রোগ সম্পর্কে এখন মানুষ অনেক সচেতন। তারপরও মাঝে মাঝেই এইচআইভি সংক্রমণের খবর শোনা যায়। এইডস বা অ্যাকুরেট ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি সিন্ড্রোম (এইডস) হলো এইচআইভি সংক্রমণের সবচেয়ে অগ্রসর পর্যায়।
এইচআইভি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। তবে বর্তমানে নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং একজন আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। এইচআইভি কীভাবে ছড়ায় এবং কীভাবে সংক্রমণ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায় এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি।
কীভাবে ছড়ায়: এইচআইভি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক তরলের মাধ্যমে একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে প্রবেশ করে। এর মধ্যে রয়েছে রক্ত, বীর্য, যোনি ও রেকটাল তরল এবং বুকের দুধ। অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্ক এইচআইভি সংক্রমণের অন্যতম প্রধান পথ। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সুরক্ষা পদ্ধতি ছাড়া যৌনসম্পর্ক করলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে যৌনাঙ্গ বা শরীরে ক্ষত থাকলে ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।
আক্রান্ত রক্ত শরীরে প্রবেশ করলেও এইচআইভি ছড়াতে পারে। যেমন-পরীক্ষা না করা বা সংক্রমিত রক্ত শরীরে দেওয়া, অথবা একই সুচ ও সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করা। মাদক গ্রহণের ক্ষেত্রে একই ইনজেকশন সরঞ্জাম ভাগাভাগি করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
এছাড়া আক্রান্ত মা থেকে গর্ভাবস্থা, প্রসবের সময় কিংবা বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে শিশুর শরীরে এইচআইভি যেতে পারে। তবে গর্ভাবস্থায় যথাযথ চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে শিশুর মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।
এইচআইভি কি ছোঁয়াচে? এইডস নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে হাত মেলানো, জড়িয়ে ধরা, একই জায়গায় বসা, একই বাসন ব্যবহার করা বা একই খাবার খাওয়ার মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ায় না। এমনকি একই টয়লেট ব্যবহার, কাশি-হাঁচি, ঘাম, চোখের পানি কিংবা মশার কামড়ের মাধ্যমেও এইচআইভি ছড়ায় না। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে দূরে সরিয়ে না দিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সম্মান দেওয়া উচিত।
নিজেকে যেভাবে সুরক্ষিত রাখবেন: এইচআইভি থেকে সুরক্ষিত থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো নিরাপদ যৌন আচরণ। যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে সুরক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পারে। একই সঙ্গে যৌনবাহিত সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কোনো অবস্থাতেই সুঁই, সিরিঞ্জ বা ইনজেকশনের সরঞ্জাম ভাগাভাগি করা উচিত নয়। রক্ত গ্রহণের প্রয়োজন হলে নিরাপদ ও পরীক্ষিত রক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ট্যাটু, পিয়ার্সিং বা শরীরে ছিদ্র করার ক্ষেত্রেও জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
যাদের এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শে প্রাক-এক্সপোজার প্রোফিল্যাক্সিস গ্রহণ করতে পারেন। প্রাক-এক্সপোজার প্রোফিল্যাক্সিস হলো এইচআইভি নেগেটিভ বা সুস্থ ব্যক্তিদের একটি প্রতিরোধমূলক ওষুধ। এইচআইভি ভাইরাসের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা এই ওষুধ নিয়মিত সেবন করলে ছড়ানোর ঝুঁকি ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারেন।
আবার সম্ভাব্য সংস্পর্শের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গেলে প্রাক-এক্সপোজার ফিল্যাক্সিস ব্যবহার করে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এটা সবচেয়ে কার্যকর হয় যত দ্রুত শুরু করা যায় এবং সাধারণত সম্ভাব্য সংস্পর্শের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শুরু করতে হয়।
এইচআইভি সংক্রমণের শুরুতে অনেকের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তাই শুধু শারীরিক লক্ষণ দেখে সংক্রমণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ঝুঁকিপূর্ণ সংস্পর্শ হয়ে থাকলে উপযুক্ত সময়ে এইচআইভি পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এইচআইভি ধরা পড়লে ভয় বা লজ্জায় চিকিৎসা থেকে দূরে থাকা উচিত নয়। নিয়মিত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি গ্রহণ করলে শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ এতটাই কমিয়ে আনা সম্ভব যে তা শনাক্তের সীমার নিচে চলে যেতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে গেলে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্য ভালো রাখা এবং যৌনপথে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধ করাও সম্ভব।
এইচআইভি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা, নিরাপদ আচরণ করা, প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করানো এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পথ। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য না করে সহানুভূতিশীল আচরণ করাও জরুরি।
সূত্র: এইচআইভি ডটগভ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ, ওয়েবএমডি
সানা/আপ্র/২২/৮/২০২৬