বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি পদে কর্মরত ব্যক্তিদের ‘মালিক’ হিসেবে গণ্য করে ‘শ্রমিক’ সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার বিধান কেন অসাংবিধানিক ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহামুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২(৪৯)(খ) ও ধারা ২(৬৫)-এর সংশ্লিষ্ট শর্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দেন।
রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব। তাঁকে সহযোগিতা করেন ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার, অ্যাডভোকেট মো. মাকসুদুর রহমান ও অ্যাডভোকেট মারুফ হাসান তমাল।
রুলে আরো জানতে চাওয়া হয়েছে, শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২(৪৯)(খ) ও ২(৬৫)-এর সংশ্লিষ্ট শর্ত কেন সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৪ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং বেআইনি ঘোষণা করা হবে না।
রিটে বলা হয়েছে, এসব বিধানের ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক বা তদারকির দায়িত্বে লিখিতভাবে নিযুক্ত ব্যক্তিদের ‘মালিক’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। অথচ তাঁদের অনেকেরই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নেই। শুধু পদবি ও দায়িত্বের ভিত্তিতে তাঁদের ‘শ্রমিক’-এর সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
রিটকারীদের দাবি, এর ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা শ্রম আইনের অধীনে বিভিন্ন আইনি সুরক্ষা, সুবিধা, পাওনা ও প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ ও ২০২৪-এর তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, এ বিধানের কারণে বেসরকারি খাতের প্রায় ৬৫ থেকে ৮০ লাখ কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁরা দেশের মোট কর্মশক্তির ১০ শতাংশেরও বেশি।
রিটকারীদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক নাগরিককে শ্রম আইনের সুরক্ষার বাইরে রাখা সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের সমান সুরক্ষা ও আইনের আশ্রয় লাভ প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
রিটে আরো বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিধানের কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মী শ্রম আদালতের এখতিয়ারের বাইরে পড়ে যাচ্ছেন। ফলে চাকরিসংক্রান্ত অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁদের কার্যকর ও উপযুক্ত আইনি ফোরাম না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আইনজীবীদের দাবি, রুল চূড়ান্তভাবে মঞ্জুর হয়ে সংশ্লিষ্ট বিধান অবৈধ ঘোষণা হলে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি পদে থাকা বিপুলসংখ্যক বেসরকারি কর্মী শ্রম আইনের বিভিন্ন সুরক্ষা ও সুবিধার আওতায় আসতে পারেন। এর মধ্যে কর্মঘণ্টা ও ওভারটাইম, বিভিন্ন ধরনের ছুটি, চাকরিচ্যুতি ও ক্ষতিপূরণ, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, শ্রম আদালতে প্রতিকার এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রভিডেন্ট ও কল্যাণ তহবিলের সুবিধা রয়েছে।
তবে এসব সুবিধা কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করবে।
রিটকারীদের দাবি, তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, ওষুধসহ বিভিন্ন বেসরকারি খাতের কর্মীরা এ রুলের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন। ফ্লোর সুপারভাইজার, মান নিয়ন্ত্রণকারী, মধ্যম সারির কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক কর্মীদের অনেকেই পদবির কারণে ব্যবস্থাপনা বা তদারকি শ্রেণিতে পড়লেও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন না।
আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার বলেন, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানায় অংশীদার না হয়েও শুধু লিখিত পদবির কারণে লাখ লাখ কর্মী শ্রম অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রুল চূড়ান্তভাবে মঞ্জুর হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা কর্মঘণ্টা, ছুটি, চাকরিচ্যুতি সুরক্ষা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও শ্রম আদালতে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগসহ বিভিন্ন শ্রম অধিকার ফিরে পেতে পারেন।
গত ৪ আগস্ট আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শককে বিবাদী করে জনস্বার্থে রিটটি করা হয়।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৩/৮/২০২৬