নারীর নিরাপদ, স্বচ্ছন্দ ও মর্যাদাপূর্ণ চলাচল নিশ্চিত করা কেবল পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সেই বিবেচনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি পথে ১৪টি গোলাপি বাস চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। বিশেষ করে নারী চালক ও সহকারী দ্বারা পরিচালিত, শুধু নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত এই পরিবহনব্যবস্থা দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব সমস্যার প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গণপরিবহনে নারীদের ভোগান্তির চিত্র নতুন নয়। অতিরিক্ত ভিড়, আসনের সংকট, বাসে উঠতে অনীহা, অনাকাঙিক্ষত স্পর্শ, হয়রানি এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু নারী প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা প্রয়োজনীয় গন্তব্যে যাতায়াতে মানসিক চাপের মুখে পড়েন। ফলে গোলাপি বাস শুধু একটি বিশেষ পরিবহনসেবা নয়; এটি নারীর চলাচলের স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগকে আরো শক্তিশালী করার একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হওয়া উচিত।
তবে উদ্যোগ গ্রহণই সাফল্যের শেষ কথা নয়। বাংলাদেশে নারী বাস সার্ভিস চালুর পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করে দেয়। ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এবং ২০০১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন সেবা চালু হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বাসের স্বল্পতা, অনিয়মিত চলাচল, দীর্ঘ অপেক্ষা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে আগের উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়েছিল। ২০০৯ সালেও পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এবার সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
প্রথমত, নির্ধারিত সময়সূচি কঠোরভাবে মানতে হবে। একটি বাস নির্দিষ্ট রুটে চলবে কি না, তা যেন কোনো দিনই অনিশ্চিত না থাকে। নারী যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্ভরযোগ্যতা। বাসের সংখ্যা না বাড়িয়ে শুধু নতুন রুট ঘোষণা করলে প্রত্যাশা পূরণ হবে না। আগামী তিন মাসে ৫০টি বাস চালুর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বড় শহরেও পর্যায়ক্রমে সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তাকে করতে হবে ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দু। বাসে স্থাপিত নজরদারি ক্যামেরা, যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং ইলেকট্রনিক টিকিট ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হবে। অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত প্রতিকারের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নারী যাত্রীর নিরাপত্তা বাসের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; বাসস্টপ, অপেক্ষার স্থান এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর পরবর্তী পথও নিরাপদ করতে হবে।
সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, এই উদ্যোগ নারীর কর্মসংস্থানের একটি নতুন দিগন্তও খুলেছে। স্নাতকোত্তর পাস রাবেয়া খাতুনের মতো নারীরা যখন ভারী যান চালানোর পেশাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন সমাজের প্রচলিত পেশাগত ধারণাও বদলাতে শুরু করে। নারী চালকদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য নয়, প্রয়োজন দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি।
চলন্ত বাসে উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেটের পরীক্ষামূলক সংযোগও ভবিষ্যৎ গণপরিবহনকে আরো আধুনিক করার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তবে প্রযুক্তির চাকচিক্যের চেয়ে জরুরি হবে নিয়মিত, নিরাপদ ও সময়নিষ্ঠ সেবা।
গোলাপি বাস তাই কেবল গোলাপি রঙের একটি বাস নয়; এটি নারীর নিরাপদ পথচলার প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি যেন আগের মতো ব্যর্থতার স্মৃতিতে পরিণত না হয়, সে জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, কঠোর তদারকি এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন। নারীকে নিরাপদে চলার অধিকার নিশ্চিত করা গেলে শুধু গণপরিবহন নয়, এগিয়ে যাবে পুরো সমাজ।
সানা/আপ্র/২০/৮/২০২৬