আবারো বাড়লো তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের দাম। রোববার (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নতুন দাম নির্ধারণ করে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করেছে। অথচ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ২ হাজার টাকা, কোথাও ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এমনকি কোথাও সিলিন্ডার নেই বলা হলেও বেশি দাম দিতে রাজি হলে ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) সকালে টঙ্গীর এক খুচরা বিক্রেতা মো. মিঠু রহমানের সঙ্গে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তিনি সিলিন্ডার নেই বলে জানান। পরে ‘গ্যাস না থাকায় বাসায় রান্না হচ্ছে না, যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে দেন’ বলা হলে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম চান ২ হাজার ৪০০ টাকা। মিঠু রহমান বলেন, ‘সিলিন্ডার এমনিতেই নেই। দাম ২ হাজার ৪০০ টাকা দেবেন। দেখি যদি ম্যানেজ করে দিতে পারি। বিকেলে একবার ফোন দিয়েন।’
শুধু টঙ্গী নয়, রাজধানী ও আশপাশের এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও বাড়তি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রোববার সকালে রাজধানীর আজিমপুর, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি সিলিন্ডার বিক্রির দোকান বন্ধ পাওয়া যায়। অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে সিলিন্ডার বিক্রি করা অনেক দোকানেও তা পাওয়া যায়নি।
আজিমপুরের এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, ‘সিলিন্ডার দেওয়া যাবে, তবে ২ হাজার ৫০০ টাকা পড়বে। নতুন বোতলসহ কিনলে ৪ হাজার টাকা দিতে হবে।’
বাজারের এমন পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গোষ্ঠীতে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা সিলিন্ডার কেনাবেচা নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। সুমাইয়া ইসলাম নামের এক ক্রেতা জানিয়েছেন, তিনি বসুন্ধরা ব্র্যান্ডের দুটি এলপিজি সিলিন্ডার ৪ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন। তার ভাষায়, একেকটি সিলিন্ডারের দাম পড়েছে ২ হাজার ৪৫০ টাকা।
‘৬৪ জেলা এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর অ্যাসোসিয়েশন’ নামের গোষ্ঠীতে মো. রাসেল লিখেছেন, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তিনি দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে সাতক্ষীরার খুচরা ব্যবসায়ী মো. লাবিব জানিয়েছেন, তিনি ওমেরা, আই গ্যাস ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ টাকা করে বিক্রি করছেন। তবে তার কাছেও পর্যাপ্ত সিলিন্ডার নেই।
এদিকে এলপিজির আমদানিতে ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন। আগস্টে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন। চাহিদার তুলনায় আমদানি পর্যাপ্ত থাকায় দেশে এলপিজির সংকট থাকার কথা নয় বলে জানিয়েছে কমিশন।
তবে বাজার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়ে ১২টি এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি। শনিবার (৩ অক্টোবর) জারি করা চিঠিতে রোববার হিসাব জমা দিতে বলা হয়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, তথ্য পাওয়ার পর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা গতকাল শনিবারও অফিস করেছি। ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছি। তারা সেপ্টেম্বরে কী পরিমাণ এলপিজি বিক্রি করেছে জানতে চেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মন্ত্রণালয় কাজ করছে। জেলা পর্যায় পর্যন্ত তদারকি করা হচ্ছে। আজ নতুন দাম ঘোষণা করা হবে। এরপর আরো কঠোরভাবে তদারকি করা হবে।’
সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে শনিবার ঢাকাসহ দেশের ১৬ জেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের ২৩টি দল এসব অভিযানে অংশ নেয়। নানা অনিয়মের দায়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অভিযানে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও প্রদান, সিলিন্ডারের নিরাপত্তা বিধি এবং মেয়াদ যাচাই করা হয়। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযৌক্তিক মজুত ও সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি থেকে ব্যবসায়ীদের বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভোক্তাদের সিলিন্ডার কেনার আগে ওজন, সিল, মেয়াদ ও দৃশ্যমান ত্রুটি পরীক্ষা এবং মূল্যতালিকা যাচাই করে রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগ জানাতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
এদিকে চলতি বছরের এপ্রিলের পর আগস্টে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা করা হয়েছিল। এর আগে জুনে ৫৫ টাকা ও জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়। সেপ্টেম্বরে আরো ১৩ টাকা কমিয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অক্টোবরের শুরুতেই এবার তা ২৫২ টাকা বেড়ে হলো ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
বিইআরসির হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে এলপিজির নির্ধারিত দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৩২ দফায় দাম বাড়ানো হয়। বিভিন্ন সময়ে দাম কমানোও হয়েছে। ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল বেসরকারি পর্যায়ের এলপিজির দাম নির্ধারণ শুরুর সময় ১২ কেজির সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল ৯৭৫ টাকা। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তা বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা হয়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে বেড়েছিল ৯৬৫ টাকা বা প্রায় ৯৯ শতাংশ।
চলতি বছরের এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বাড়িয়ে সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকা করা হয়েছিল। এরপর কয়েক দফা কমে সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৫৮৫ টাকায় নেমেছিল। এখন আবার এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়ানো হলো।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এলপিজি সরকার আমদানি করে না। এটা বেসরকারি কোম্পানি আনে। এটাকে ঠিক রাখার জন্য আমরা কাজ করছি। দিন-রাত কাজ করছি। সুতরাং দেখা যাক কতদূর কী করা যায়।’
সানা/আপ্র/৫/১০/২০২৬