গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

মানবাধিকারের আয়নায় সেপ্টেম্বরের নির্মম বাংলাদেশ

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৫:৪৩ পিএম, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৬:৫৬ এএম ২০২৬
মানবাধিকারের আয়নায় সেপ্টেম্বরের নির্মম বাংলাদেশ
ছবি

ফাইল ছবি


সেপ্টেম্বরের মানবাধিকার পরিস্থিতির দুটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন শুধু উদ্বেগের তথ্য দেয়নি, রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে এক কঠিন আয়নাও ধরেছে। সেই আয়নায় দেখা যাচ্ছে-জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক সহিংসতা, অজ্ঞাতনামা লাশ, সাংবাদিক হয়রানি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা, সীমান্তে প্রাণহানি এবং নারী ও কন্যাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের এক ভয়ংকর সমান্তরাল বাস্তবতা। প্রশ্নটি তাই কেবল কতজন নিহত, আহত বা নির্যাতিত হয়েছেন, তা নয়; প্রশ্ন হলো, নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর?

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে সেপ্টেম্বরে মব সহিংসতার অন্তত ৬৫টি ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হয়েছেন। আগস্টের তুলনায় নিহতের সংখ্যা কমলেও এতে স্বস্তির অবকাশ নেই। চুরি, ডাকাতি, জমি ও অর্থনৈতিক বিরোধ, বাকবিতণ্ডা কিংবা যৌন সহিংসতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে জনতার বিচার চলতে থাকলে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়। অপরাধের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং শাস্তি দেওয়ার অধিকার আদালতের; জনতার নয়। রাষ্ট্র যদি এই সীমারেখা কার্যকরভাবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আইন অমান্যের সংস্কৃতি ক্রমেই সামাজিক বৈধতা পেতে পারে।

হেফাজতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান আরো কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। আগস্টে নয়জনের বিপরীতে সেপ্টেম্বরে কারা হেফাজতে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছেন একজন নারীও। বন্দিত্ব কারো মৌলিক মানবিক অধিকার কেড়ে নেয় না। ফলে হেফাজতে প্রতিটি মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত, পর্যাপ্ত চিকিৎসা, মানবিক আচরণ এবং দায় নির্ধারণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব।

রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩৮৪ জন আহত ও অন্তত একজন নিহত হওয়ার তথ্যও উপেক্ষণীয় নয়। অশনাক্ত হামলায় আরো সাতজন নিহত এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৭১টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলেছে। গলা কাটা, বস্তাবন্দি, হাত-পা বাঁধা কিংবা রক্তাক্ত অবস্থায় লাশ উদ্ধারের মতো ঘটনা কেবল অপরাধের ভয়াবহতাই প্রকাশ করে না; দ্রুত ও কার্যকর তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে।

নারী ও কন্যাদের পরিস্থিতি যেন এই অন্ধকারের আরেক অধ্যায়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবে সেপ্টেম্বরে ২৫২ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার ৪৯ জনের মধ্যে ৩০ জন কন্যা। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে চার কন্যাকে। একই মাসে ৫২ নারী ও কন্যা হত্যার শিকার এবং ৪৫ জনের রহস্যজনক মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। যৌন নিপীড়ন, যৌতুকজনিত নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, অপহরণ ও বাল্যবিবাহের ঘটনাও দেখিয়ে দিয়েছে-ঘর, সমাজ ও জনপরিসর কোথাও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।

এই বাস্তবতায় প্রতিক্রিয়াশীল প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রতিটি মব সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া, হেফাজতে মৃত্যুর স্বাধীন তদন্ত, অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় শনাক্ত ও মৃত্যুর কারণ উদঘাটন, নারী ও কন্যাদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা ও দ্রুত বিচার, সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সংখ্যালঘু ও সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

মানবাধিকার কোনো দয়া বা প্রশাসনিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, তার বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে আইন কেবল কাগজে থাকে। আর বিচারহীনতা যখন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন মবের লাঠি, নির্যাতকের হাত এবং অপরাধীর অস্ত্র-সবই আইনের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সেপ্টেম্বরের হিসাব তাই শুধু পরিসংখ্যান নয়, রাষ্ট্রের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা। এখনই আইনের শাসনকে দৃশ্যমান করতে হবে-কারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ রাষ্ট্রের কাছে কোনো উন্নয়ন, কোনো প্রতিষ্ঠান এবং কোনো পরিসংখ্যানই শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। 
সানা/আপ্র/৩/১০/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

গণপরিবহনে স্বাধীন পোশাকে হস্তক্ষেপ বন্ধ প্রয়োজন
০১ অক্টোবর ২০২৬

গণপরিবহনে স্বাধীন পোশাকে হস্তক্ষেপ বন্ধ প্রয়োজন

মেট্রোরেলে অ্যাথলেটকে হেনস্তা

প্রতিরোধযোগ্য হামে হাজার প্রাণহানির দায় কার
০১ অক্টোবর ২০২৬

প্রতিরোধযোগ্য হামে হাজার প্রাণহানির দায় কার

হাম নিয়ন্ত্রণে টিকা আছে, প্রতিরোধের কার্যকর কৌশল আছে, বিশ্বজুড়ে পরীক্ষিত জনস্বাস্থ্যব্যবস্থাও আছে। ত...

সাইবার নিরাপত্তার নামে সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় শিকল নয়
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাইবার নিরাপত্তার নামে সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় শিকল নয়

অন্তর্জালজগতের অপরাধ দমন, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তার রোধে এক...

আইনের শাসন কি দখলদারির কাছে পরাজিত?
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আইনের শাসন কি দখলদারির কাছে পরাজিত?

একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রভাণ্ডারে নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে। নাগরিকের নিরাপত্তা, সম্পদের সুরক...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বিএনপিকে চাঁদাবাজ বললে বিচার করবে জনগণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকারকে ঢালাওভাবে দোষারোপ এবং বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে কেউ বক্তব্য দিয়ে থাকলে, তার বিচার জনগণ করবে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- জনগণ বিচার করবে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে