হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা উচ্চমূল্যের সামরিক উড়োজাহাজে আঘাত হানতে সক্ষম নতুন ধরনের অতিদ্রুতগামী ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তৈরি করেছে চীন। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) প্রকাশিত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনা সামরিক বাহিনী এমন অতিদ্রুতগামী গ্লাইড যান তৈরি করেছে, যা আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র বহন ও উৎক্ষেপণ করতে পারে। এর মাধ্যমে দূরবর্তী কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকারী উড়োজাহাজসহ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের উড়োজাহাজ সাধারণত সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি না থেকে দূরবর্তী অবস্থান থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সহায়তা করে।
চীনের নতুন এই সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশযুদ্ধে ব্যবহৃত জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ, আকাশ থেকে আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণকারী বিমান এবং উড়ন্ত কমান্ডকেন্দ্রের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে। এসব উড়োজাহাজ যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামরিক কর্মকাণ্ডকে দূর থেকে সহায়তা করে।
বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি অবগত একটি সূত্র ব্লুমবার্গকে জানিয়েছে, চীনা সামরিক বাহিনী কয়েকটি অতিদ্রুতগামী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে আকাশ থেকে আকাশে লক্ষ্যভেদের সক্ষমতা যুক্ত করেছে। পাশাপাশি কয়েক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রে জাহাজবিধ্বংসী সক্ষমতাও যুক্ত করা হয়েছে।
অতিদ্রুতগামী গ্লাইড যান হলো এমন একটি অস্ত্রবাহী ব্যবস্থা, যা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের উচ্চতায় পৌঁছানোর পর শব্দের চেয়ে বহুগুণ বেশি গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেতে পারে এবং পথ পরিবর্তন করতে পারে। এর এই কৌশলগত গতিশীলতা প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় গতিপথ অনুমান ও প্রতিহত করা আরো কঠিন করে তুলতে পারে।
চীনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডারের পরিসরও এ নতুন সক্ষমতার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। চীনের ডিএফ-১৭ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য অতিদ্রুতগামী গ্লাইড যান প্রায় ২ হাজার ৪১৪ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এ দূরত্ব চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি গুয়ামের দূরত্বের কাছাকাছি। অন্যদিকে ডিএফ-২৭ ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক সর্বোচ্চ পাল্লা ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার কিলোমিটার বলে বিভিন্ন মার্কিন প্রতিরক্ষা মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে, যার আওতায় হাওয়াইও পড়তে পারে।
চীনের এই অগ্রগতি দেশটির দ্রুত সম্প্রসারিত ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডারেরই অংশ। বিভিন্ন মার্কিন মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ চীনের কাছে ৩ হাজার ১৫০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৩০০টি স্থলভিত্তিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন তার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে শুধু প্রচলিত স্থল ও সমুদ্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের জন্য নয়, প্রতিপক্ষের সামগ্রিক সামরিক কাঠামোকে একযোগে অকার্যকর করার লক্ষ্যে পুনর্গঠন করছে।
তবে দূরবর্তী উড়োজাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে আঘাত হানা অত্যন্ত জটিল। সর্বোচ্চ পাল্লায় ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে ২০ মিনিট বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। ফলে চলমান উড়োজাহাজকে আঘাত করতে হলে পুরো সময়জুড়ে অত্যন্ত নির্ভুল ও হালনাগাদ লক্ষ্যসংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন হবে।
এ ধরনের ব্যবস্থায় আরেকটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। প্রচলিত ও পারমাণবিক-দুই ধরনের অস্ত্র বহনে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার প্রতিপক্ষের কাছে ভুল সংকেত সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে একটি প্রচলিত হামলাকে পারমাণবিক হামলা হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা হলে তা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সংঘাতকে আরো ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
চীনের এই অগ্রগতির পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ফলে সামরিক প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা এখন শুধু যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং দূর থেকে প্রতিপক্ষের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতার ‘স্নায়ুকেন্দ্র’ অকার্যকর করার ক্ষমতাও হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
চীনের নতুন প্রযুক্তি এখনো কতটা কার্যকর এবং বাস্তব যুদ্ধে এর সক্ষমতা কতটা-সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত। তবে গবেষণা ও প্রতিরক্ষা মূল্যায়নগুলো বলছে, অতিদ্রুতগামী অস্ত্রের সঙ্গে আকাশ থেকে আকাশে লক্ষ্যভেদের সক্ষমতার সমন্বয় সামরিক কৌশলের প্রচলিত ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। সূত্র: ব্লুমবার্গ
সানা/আপ্র/২৬/৮/২০২৬