পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকটে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হলেও ভারতকে জ্বালানি ও সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে রাশিয়া। সোমবার মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠকে এ আশ্বাস দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের দ্রুত বাড়তে থাকা বাণিজ্য এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যঘাটতি কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
দুই দিনের রাশিয়া সফরে থাকা জয়শঙ্কর সোমবার পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি রাশিয়ার প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী দেনিস মানতুরভের সঙ্গে ভারত-রাশিয়া আন্তসরকার কমিশনের বাণিজ্য, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতাবিষয়ক ২৭তম বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আগে তাঁর এই সফর অনুষ্ঠিত হলো। ওই সম্মেলনে পুতিনের ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের কৃষি খাতের প্রয়োজন মেটাতে রাশিয়া সার সরবরাহ বাড়াচ্ছে বলে জানান তিনি। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় কৃষক ও কৃষি খাতের চাহিদা পূরণে রাশিয়া প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও সরবরাহ অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত। গত বছর ভারত রাশিয়া থেকে প্রায় ৬৫ লাখ টন সার আমদানি করেছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি।
বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, গত বছর দুই দেশের বাণিজ্যে সামান্য পতন হলেও চলতি বছরে তা আবার বাড়ছে। দুই দেশের সরকার, সংসদ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব পর্যায়ে সহযোগিতা জোরদার হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জয়শঙ্কর অবশ্য দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি বড় দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ভারত-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় চার গুণ বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রায় ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু একই সময়ে ভারতের বাণিজ্যঘাটতি ৬৬০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি হয়েছে। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করাকে ভারত এখন অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।
জয়শঙ্কর বলেন, বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো, অর্থ লেনদেনের কার্যকর ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো হলে এই ভারসাম্যহীনতা কমানো সম্ভব হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের বাণিজ্য ১০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা অর্জনেও এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে জ্বালানি, সার, পারমাণবিক শক্তি ও উচ্চপ্রযুক্তি রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যে সরবরাহব্যবস্থায় ঝুঁকি কমানো ও উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও জয়শঙ্কর তুলে ধরেন।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা ও ব্যক্তিগত বার্তা পৌঁছে দেন জয়শঙ্কর। তিনি জানান, মোদি প্রথমে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করতে এবং পরে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তাঁকে স্বাগত জানাতে আগ্রহী। পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন নিয়েও দুই দেশের আগ্রহ রয়েছে।
বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় জয়শঙ্কর জানান, পুতিনকে আন্তসরকার কমিশনের বৈঠকের আলোচনা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন তিনি। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয় নিয়েও তাঁদের আলোচনা হয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার মধ্যেও ভারত-রাশিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক যে ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, মস্কোর সর্বশেষ বৈঠককে তারই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও সারের মতো কৌশলগত পণ্যের সরবরাহ অব্যাহত রাখার রুশ আশ্বাস ভারতের খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তথ্যসূত্র: পিটিআই
সানা/আপ্র/২৫/৮/২০২৬