রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় উলামা-মাশায়েখ কনভেনশনে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদুদীর মতাদর্শ নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন কওমি ঘরানার আলেম ও বিভিন্ন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাঁরা বলেছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা-বিশ্বাসের বিষয়ে কোনো আপস করা যাবে না। কওমি অঙ্গনে জামায়াতের ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকাতেও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তাঁরা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের মাল্টিপারপাস হলে এ কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা-বিশ্বাস সংরক্ষণে গণসচেতনতা সৃষ্টি, হেযবুত তওহীদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইন বাতিলের দাবিতে ইমান-আকিদা সংরক্ষণ কমিটি এ আয়োজন করে।
কনভেনশনে হেফাজতে ইসলাম ও দেওবন্দ ঘরানার বিভিন্ন আলেম বক্তব্য দেন। বক্তাদের কয়েকজন অভিযোগ করেন, কওমি অঙ্গনে জামায়াতের ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটছে। তাঁদের মতে, এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামপন্থী দলগুলোর কোনো ঐক্য হতে দেওয়া যাবে না।
মওদুদীবাদ নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান: কনভেনশনে প্রধান অতিথি হিসেবে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত হননি। তাঁর লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানো হয়। এতে বলা হয়, মওদুদীবাদের মতাদর্শিক ভুল ও বিভ্রান্তি সম্পর্কে উম্মাহকে সতর্ক থাকতে হবে। কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতেই ইসলামি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক মনগড়া ব্যাখ্যার ওপর তা প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান বলেন, ভ্রান্ত মতাদর্শের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সরকার যেন কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস না করে এবং ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের পরামর্শ নেয়।
তিনি হেযবুত তওহীদের কার্যক্রম দ্রুত নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ, সংগঠনটি পাশের কোনো দেশের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে ট্রান্সজেন্ডার আইন বাস্তবায়ন না করারও আহ্বান জানান তিনি।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির আল্লামা আবদুল হামিদ বলেন, যারা সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করে না, তারা ইসলামের শত্রু। তাঁর দাবি, জামায়াত কোনো দিন ইসলামের কাজ করেনি। তিনি শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর পরিবর্তে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে হানাফি মাজহাবের যোগ্য কাউকে নিয়োগের দাবি জানান।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বলেন, সরকার আলেমদের বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিলে তাদের ভবিষ্যৎ ভালো হবে না। দেওবন্দ ঘরানার আলেমদের মধ্যে কোনো ‘অনুপ্রবেশকারী’ ঢুকলে ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিহত করার আহ্বান জানান তিনি।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ইমান-আকিদা সংরক্ষণে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে কোনো আপস করা যাবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মতের অধীনে যে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, তা তাঁরা স্বাগত জানাবেন। তবে ভ্রান্ত মতাদর্শের ওপর নির্ভর করে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তাঁরা মেনে নেবেন না।
হেযবুত তওহীদ ও কাদিয়ানী প্রসঙ্গ: লিখিত বক্তব্যে হেফাজতে ইসলামের আমির হেযবুত তওহীদের কার্যক্রম ও প্রচারণা নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। তাঁর মতে, দেশের ধর্মীয় শান্তি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আকিদাগত নিরাপত্তার স্বার্থে এ বিষয়ে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই বক্তব্যে আহমদিয়া মুসলিম জামায়াতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করার দাবিও জানানো হয়।
কনভেনশনে আলেমরা মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করারও প্রতিবাদ জানান।
কনভেনশনে বিশেষ আলোচক হিসেবে পাকিস্তানের সারগোদাহর মারকাজ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের পরিচালক মাওলানা ইলিয়াস গুম্মান উর্দু ভাষায় বক্তব্য দেন।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল আউয়ালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কনভেনশনে সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব, সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ, হবিগঞ্জের মাদ্রাসায়ে নূরে মদিনার অধ্যক্ষ আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী, আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়তের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দিন রব্বানী এবং নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুল কাইয়ুম সুবহানীসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন, ফরায়েজী আন্দোলনের সভাপতি আবদুল্লাহ মোহাম্মদ হাসান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি আবদুর রব ইউসুফী, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব সাখাওয়াত হোসেন রাজি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান হামিদী এবং জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুফতি রেজাউল করীম আবরারসহ অর্ধশতাধিক আলেম বক্তব্য দেন।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৫/৮/২০২৬