আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তদের মামলা ও বিচার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রাধান্য পেয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম (তুলি)।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে গুমের তদন্তের অগ্রগতি জানতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ অভিযোগ করেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর পক্ষ থেকে সানজিদা ইসলাম ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা সেখানে যান।
সানজিদা ইসলাম বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, গুমের অভিযোগগুলোর তদন্ত ও বিচার ট্রাইব্যুনালে দ্রুত এগোবে। ‘মায়ের ডাক’ থেকে প্রায় ১৫০টি গুমের অভিযোগ চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগে এক যুগের বেশি সময়ের তথ্য-উপাত্তও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর তিন মাস সময়ে তাঁরা কোনো তদন্তের অগ্রগতি দেখেননি।
তিনি বলেন, তাঁরা চেয়েছিলেন গুমের সব ঘটনার বিচার একসঙ্গে শুরু হোক, সেখানে কোনো বাছাই থাকবে না। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের গুমের তিনটি মামলাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।
সানজিদা বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত বা মামলা হয়নি। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরও এক বছর তিন মাস কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বাইরে গিয়ে কাজ করা প্রয়োজন ছিল, যা করা হয়নি।
তাঁর উল্লেখ করা মামলাগুলোর মধ্যে একটি র্যাবের টিএফআই সেলে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমসহ (আরমান) কয়েকজনকে গুম করে রাখার ঘটনায় করা। এ মামলায় বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিচার চলছে। আরেকটি মামলা ডিজিএফআইয়ের জেআইসিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমীসহ কয়েকজনকে গুমের ঘটনায়। এ মামলায় বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিচার চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর ছিলেন মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। বর্তমান সরকারের সময়ে এ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন মো. আমিনুল ইসলাম।
দল দেখে বিচার নয়: সানজিদা ইসলামের অভিযোগের পর চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, গুমের শিকার সব পরিবারের প্রতি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের অকৃত্রিম সহানুভূতি রয়েছে। কে কোন দলের সঙ্গে যুক্ত, তা বিবেচনা করে তাঁরা বিচার করতে চান না।
তিনি বলেন, মীর আহমাদ বিন কাসেম ও আবদুল্লাহিল আমান আযমীর মতো কয়েকজনের গুমের বিচার চলছে। তাঁরা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের অনুসারী হতে পারেন। এর অর্থ এই নয় যে বিএনপির যাঁরা গুমের শিকার হয়েছেন, তাঁদের বিচার হবে না। বিষয়টি তাঁরা দলীয়ভাবে দেখতে চান না।
আওয়ামী লীগের কেউ গুমের শিকার হয়ে থাকলেও তাঁদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
২৫০ পরিবার গুমের শিকার, বলছে তদন্ত সংস্থা: গুমের তদন্তের অগ্রগতির তথ্য জানিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত ২৫০টি পরিবারের সদস্য গুমের শিকার হয়েছেন—এমন তথ্যের সত্যতা তাঁরা পেয়েছেন। এসব পরিবারকে তাঁরা চিহ্নিতও করেছেন। ওই ২৫০ জন এখনো ফেরত আসেননি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে অপহরণের শিকার হয়েছেন বলেও তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন।
তিনি বলেন, গুমের শিকার প্রত্যেক পরিবারের সদস্যের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে। যেসব স্থান থেকে তাঁদের অপহরণ করা হয়েছিল, সেগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে। সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিবার ধরে ধরে তদন্ত করতে সময় লাগছে।
তদন্ত সংস্থার পাঁচজন কর্মকর্তা গুমের ঘটনাগুলো তদন্ত করছেন জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্ত শেষ করে তাঁরা দ্রুত প্রতিবেদন দেবেন।
সানা/আপ্র/২৫/৮/২০২৬