গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

মেনু

কর আদায়ে কঠোরতা, তথ্য মিলিয়েই ফাঁকি ধরবে এনবিআর

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১:২৫ পিএম, ২৬ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ০২:৪০ এএম ২০২৬
কর আদায়ে কঠোরতা, তথ্য মিলিয়েই ফাঁকি ধরবে এনবিআর
ছবি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)-ফাইল ছবি

কর ফাঁকি শনাক্ত ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এতদিন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রধান ভরসা ছিল করদাতার নিজস্ব ঘোষণাপত্র, কাগজপত্র যাচাই ও কর কর্মকর্তাদের অনুসন্ধান। এবার সেই প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে চায় এনবিআর।

নতুন পরিকল্পনায় করদাতা কত আয় দেখিয়েছেন, ব্যাংকে কত টাকা জমা হয়েছে, কত দামের গাড়ি কিনেছেন, কতবার বিদেশ গেছেন, কোথায় জমি বা ফ্ল্যাট কিনেছেন, শেয়ারবাজারে কত বিনিয়োগ করেছেন কিংবা শিক্ষা ও চিকিৎসায় কত ব্যয় করেছেন-এসব তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় এনে মিলিয়ে দেখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও শুধু হিসাবের খাতায় দেখানো বিক্রয় ও মুনাফার ওপর নির্ভর করতে চায় না রাজস্ব প্রশাসন। একটি কোম্পানি কত কাঁচামাল আমদানি করেছে, স্থানীয়ভাবে কত কাঁচামাল সংগ্রহ করেছে, তার উৎপাদন সক্ষমতা কত, বাজারে তার অংশীদারত্ব কত এবং এর তুলনায় কত টাকা কর ও ভ্যাট দিচ্ছে-এসব তথ্যও বিশ্লেষণ করা হবে।

অর্থাৎ ব্যক্তি থেকে করপোরেট-রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তে এনবিআরের নতুন কৌশলের মূল কথা হলো তথ্য মিলিয়ে অসঙ্গতি খুঁজে বের করা। এই তথ্যসমন্বয়ই কর আদায় বাড়ানোর বহুল প্রত্যাশিত ‘জাদুর চাবিকাঠি’ হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

ঘোষিত আয় বনাম প্রকৃত জীবনযাত্রা: এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে করদাতাদের জন্য সমন্বিত প্রোফাইল তৈরি করা হবে। এতে আয়কর রিটার্নে ঘোষিত তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব ও বড় অঙ্কের লেনদেন, ঋণপত্রের মাধ্যমে ব্যয়, জমি-ফ্ল্যাটের ক্রয়-বিক্রয়, গাড়ির মালিকানা, কোম্পানির মালিকানা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, বিদেশ ভ্রমণ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় এবং ভাড়া থেকে আয়সহ বিভিন্ন তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখা হবে।

এনবিআরের পরিকল্পনায় উদাহরণ হিসেবে এমন পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে-কোনো ব্যক্তি বছরে ১২ লাখ টাকা আয় ঘোষণা করেছেন। অথচ তাঁর ব্যাংক হিসাবে রয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তিনি ৫০ লাখ টাকার গাড়ি কিনেছেন, ১ কোটি টাকার জমি কিনেছেন এবং বছরে কয়েকবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। ঘোষিত আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে এমন বড় ব্যবধান নতুন তথ্য মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হওয়ার কথা।

বর্তমান ব্যবস্থায় এ ধরনের অসঙ্গতি শনাক্ত করতে কর্মকর্তাদের আলাদাভাবে তথ্য সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও নথি যাচাই করতে হয়। জনবল, সময় ও তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতার কারণে বিপুলসংখ্যক করদাতাকে কার্যকরভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নতুন ব্যবস্থায় পদ্ধতিটি হবে উল্টো। কোটি কোটি তথ্যের মধ্যে প্রযুক্তি প্রথমে সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেন ও জীবনযাত্রার ধরন চিহ্নিত করবে। এরপর কর্মকর্তারা উচ্চঝুঁকির করদাতাদের ওপর বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। এটিই মূলত ঝুঁকিভিত্তিক কর প্রশাসন।

নতুন ব্যবস্থার ‘জাদুর চাবিকাঠি’: বাংলাদেশে কর প্রশাসনের বড় সমস্যা করের হার নয়, বরং করজালের বাইরে থাকা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শনাক্ত করতে না পারা-এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দিলেও প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় কম কর দেন বলে সন্দেহ রয়েছে। আবার কারও কর শনাক্তকরণ নম্বর থাকলেও বছরের পর বছর রিটার্ন দেন না। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকলেও অনেকে কর ব্যবস্থার আওতার বাইরেই রয়ে গেছেন।

এনবিআরের নতুন পরিকল্পনায় এই চার শ্রেণিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো-নিয়মিত রিটার্ন ও কর প্রদানকারী সক্রিয় করদাতা; রিটার্ন দিলেও কর দেন না এমন ব্যক্তি; কর শনাক্তকরণ নম্বর থাকলেও রিটার্ন দেন না এমন ব্যক্তি; এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকলেও কর শনাক্তকরণ নম্বর নেই এমন ব্যক্তি।

এই শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে একটি সক্রিয় করদাতা নিবন্ধনভিত্তিক তালিকা তৈরির পরিকল্পনা করছে এনবিআর।

বিশ্লেষকদের মতে, কর প্রশাসনের আসল শক্তি হতে পারে এখানেই। নতুন করদাতা খুঁজে বের করতে শুধু প্রচার চালিয়ে মানুষকে কর দিতে উৎসাহিত করলেই হবে না; বাস্তবে যারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন, তাঁদের নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করতে হবে। অর্থাৎ করদাতা খুঁজতে আর শুধু করদাতার দরজায় যেতে হবে না; অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য থেকেই সম্ভাব্য করদাতাকে শনাক্ত করার চেষ্টা করবে এনবিআর।

ব্যক্তি করদাতার পর করপোরেটের ‘তথ্য নিরীক্ষা’: কর ফাঁকির অভিযোগ বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই বেশি আলোচিত। একটি কোম্পানি প্রকৃতপক্ষে কত উৎপাদন করছে, কত বিক্রি করছে এবং এর তুলনায় কত রাজস্ব দিচ্ছে-এর নির্ভরযোগ্য উত্তর সব সময় পাওয়া সহজ নয়।

এ কারণে করপোরেট আয়কর ফাঁকি রোধে এনবিআর একাধিক আর্থিক সূচক বিশ্লেষণের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানির মোট বিক্রয় ও ঘোষিত মুনাফার সম্পর্ক, মোট মুনাফার অনুপাত, সুদ ব্যয়, ব্যবস্থাপনা ফি, রয়্যালটি, কমিশন, অবচয়, মন্দঋণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন এবং পরিচালকদের সম্মানী।

এর সঙ্গে যুক্ত হবে আমদানি করা কাঁচামালের বিপরীতে স্থানীয় বাজারে বিক্রির হিসাব এবং মূল্য সংযোজন করের মোট বিক্রয়ের সঙ্গে আয়কর রিটার্নে দেখানো মোট বিক্রয়ের তুলনা।

একই শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শিল্পভিত্তিক মানদণ্ড তৈরির কাজও চলছে। একই ধরনের ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোর উৎপাদন, বিক্রয়, মুনাফা ও কর প্রদানের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য থাকলে তা সহজে নজরে আসতে পারে।

এই ধারণার বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়েছে চারটি খাতে-সিমেন্ট, সিগারেট, খাদ্য ও পানীয় এবং এমএস পণ্য বা রড-ঢেউটিনসহ সংশ্লিষ্ট খাতে।

প্রাথমিকভাবে এসব খাতের বাজারের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানি, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত উপকরণ, উৎপাদিত পণ্যের বাজার অংশ এবং রাজস্ব প্রদানের তথ্য বিশ্লেষণ করছে এনবিআর।

কাঁচামাল থেকে বাজার, মিলবে পুরো হিসাব: একটি সিমেন্ট কোম্পানি কত ক্লিংকার আমদানি করেছে, সেই কাঁচামাল দিয়ে আনুমানিক কত উৎপাদন হওয়ার কথা এবং এর তুলনায় কোম্পানিটি কত পণ্য বিক্রি করেছে-এসব হিসাব মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি করতে চায় এনবিআর।

একইভাবে সিগারেট কোম্পানির কাঁচামাল ব্যবহার, উৎপাদন ও বাজারে বিক্রির তথ্য যাচাই করা হবে। খাদ্য ও পানীয় খাতে পানি, এনার্জি ড্রিংকস, কার্বনেটেড ও নন-কার্বনেটেড পানীয়ের বাজার অংশ এবং রাজস্ব তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে। রড, ঢেউটিন ও প্রি-ফেব্রিকেটেড অবকাঠামো তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও কাঁচামাল থেকে বাজার পর্যন্ত তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে।

এই পদ্ধতির বড় সুবিধা হলো, কোনো কোম্পানির একটি রিটার্ন বা একটি হিসাবের ওপর নির্ভর করতে হবে না।

ধরা যাক, একই ধরনের দুটি কোম্পানি প্রায় সমপরিমাণ কাঁচামাল ব্যবহার করছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় ও রাজস্ব অন্যটির তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম। আবার একটি কোম্পানি বাজারে বড় অংশীদার হলেও তার কর প্রদানের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। এমন পরিস্থিতিতে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এনবিআরকে প্রশ্ন করার যৌক্তিক ভিত্তি দিতে পারে।

এভাবে রাজস্ব ফাঁকি কমানোর পাশাপাশি বাজারে অসম প্রতিযোগিতাও কমানোর সুযোগ রয়েছে। যারা নিয়ম মেনে কর ও ভ্যাট দেন, তাঁদের তুলনায় ফাঁকি দিয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করলে অসৎ প্রতিষ্ঠান বাড়তি সুবিধা পায়। ফলে শুধু সরকার রাজস্ব হারায় না, সৎ ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।

শুধু নতুন কর নয়, পুরোনো ফাঁকিও খুঁজবে: এনবিআরের নতুন কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বকেয়া রাজস্ব আদায়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আদায়যোগ্য বকেয়া ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছে এনবিআর।

এই বকেয়া আদায়ের জন্য পৃথক আয়কর তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অখালাসকৃত ও বাজেয়াপ্ত পণ্য দ্রুত নিলোামের মাধ্যমে বিক্রি করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে কাস্টমস।

বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলমান মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কর অব্যাহতির সুবিধা আরো যৌক্তিক করার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৭ হাজার ১৬০ কোটি টাকার কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে এনবিআরের তথ্য থেকে জানা গেছে।

অর্থাৎ রাজস্ব বাড়ানোর নতুন কৌশল কেবল নতুন করদাতা খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনটি উৎসকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে-করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা; বিদ্যমান করদাতাদের প্রকৃত আয় ও ব্যবসার সঙ্গে কর প্রদানের সামঞ্জস্য যাচাই করা; এবং বকেয়া কর ও ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব কার্যকরভাবে আদায় করা।

তিন মাস থেকে তিন বছর, এনবিআরের রোডম্যাপ: এনবিআর পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি ধাপে সময়সীমা নির্ধারণ করেছে।

আগামী তিন মাসের মধ্যে কর শনাক্তকরণ নম্বরের তথ্যভান্ডার পরিচ্ছন্ন ও শ্রেণিবিন্যাস, শীর্ষ বকেয়া করদাতার তালিকা তৈরি এবং উচ্চঝুঁকির কোম্পানি ও উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্য পৃথক ইউনিট কার্যকর, করদাতাদের রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে প্রচার এবং কেন্দ্রীয় ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি, যানবাহন ও কোম্পানির তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে স্বয়ংক্রিয় আয়-সম্পদ প্রোফাইল তৈরি এবং বৈদ্যুতিন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন পরীক্ষামূলকভাবে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এক থেকে দুই বছরের মধ্যে আগে থেকেই পূরণ করা বা প্রস্তুতকৃত আয়কর রিটার্ন, দেশব্যাপী ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা, মুখোমুখি যোগাযোগ ছাড়া কর নির্ধারণ এবং স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।

আর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সমন্বিত করদাতা হিসাব, তৃতীয় পক্ষের তথ্যের পূর্ণাঙ্গ মিল যাচাই, আয়কর তথ্যভান্ডার এবং আধুনিক তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

কর কর্মকর্তার বদলে ব্যবস্থা বাছাই করবে কাকে নিরীক্ষা করা হবে: নতুন ব্যবস্থার আরেকটি বড় পরিবর্তন হতে পারে নিরীক্ষা ব্যবস্থায়। বর্তমানে কোন করদাতা বা কোম্পানির হিসাব বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হবে, সেই সিদ্ধান্তে কর্মকর্তার ভূমিকা তুলনামূলক বেশি। নতুন ব্যবস্থায় ঝুঁকির বিভিন্ন সূচক ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরীক্ষার জন্য করদাতা বা কোম্পানি নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে চালু করা হবে মুখোমুখি যোগাযোগ ছাড়া কর নির্ধারণ ও নিরীক্ষা।

এতে করদাতাকে বারবার কর কর্মকর্তার কাছে যেতে হবে না। ডিজিটাল ব্যবস্থায় নথি ও ব্যাখ্যা জমা দিয়ে নিরীক্ষা ও কর নির্ধারণের বড় অংশ সম্পন্ন করা যাবে।

নীতিগতভাবে এটি হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ কমাতে পারে। তবে এর জন্য ব্যবস্থা স্বচ্ছ, নির্ভুল ও জবাবদিহিমূলক হওয়া জরুরি। কারণ, ভুল তথ্য বা ভুল হিসাবের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উচ্চঝুঁকির হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তা নতুন ধরনের হয়রানির কারণ হতে পারে।

উচ্চ সম্পদশালীদের জন্য আলাদা নজরদারি: বাংলাদেশে উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি বা ধনীদের প্রকৃত সম্পদ ও কর প্রদানের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।

এ কারণে তাঁদের জন্য পৃথক প্রোফাইল ও বিশেষ ইউনিট কার্যকর করার পরিকল্পনা করেছে এনবিআর। এই শ্রেণির ব্যক্তিদের সম্পদ, বিনিয়োগ, ব্যাংক লেনদেন, বিদেশ ভ্রমণ, কোম্পানির মালিকানা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে কর দেওয়ার সক্ষমতার সঙ্গে প্রদত্ত করের সামঞ্জস্য যাচাই করা হবে।

তবে শুধু উচ্চ সম্পদশালী হিসেবে কাউকে চিহ্নিত করলেই হবে না। সেই তথ্য কতটা নির্ভুল এবং কোন আইনি কাঠামোর আওতায় তা ব্যবহার করা হবে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থপাচার ঠেকাতে বিদেশেও নজরদারি: বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার ও রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তে প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোতে বাংলাদেশ মিশনে কাস্টমস অ্যাটাশে পদ তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছে এনবিআর।

কারণ, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার বা পণ্যের মূল্য নিয়ে কারসাজি শনাক্ত করতে শুধু বাংলাদেশের তথ্য যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশে কোনো পণ্য ১০০ ডলারে আমদানি দেখানো হলেও রপ্তানিকারক দেশের তথ্য অনুযায়ী তার প্রকৃত মূল্য ৬০ বা ১৫০ ডলার হতে পারে। এই ধরনের পার্থক্য যাচাই করতে উৎস দেশ, রপ্তানিকারক, কোম্পানির পরিচয় ও প্রকৃত বাণিজ্যিক লেনদেনের তথ্য প্রয়োজন।

কাস্টমস অ্যাটাশে ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিদেশি উৎস থেকে এসব তথ্য সংগ্রহের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হতে পারে।

৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ, কঠিন লক্ষ্য: এনবিআরের পরিকল্পনার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হলো দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো। বর্তমানে এই হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। স্বল্পমেয়াদে এটি আরো ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো, মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে। কারণ শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করলেই কর-জিডিপি অনুপাত দ্রুত বাড়বে না।

এর জন্য প্রয়োজন সঠিক ও মানসম্মত তথ্যভান্ডার, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর তথ্য বিনিময়, ব্যাংক, ভূমি নিবন্ধন, বিআরটিএ, শেয়ারবাজার, কোম্পানি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যের মান ও সামঞ্জস্য, তথ্য সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার সুস্পষ্ট নীতি, দক্ষ প্রযুক্তিগত জনবল, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত আইন প্রয়োগ।

এনবিআর গত অর্থবছরে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করেছে। চলতি অর্থবছরে সংস্থাটির জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বড় ব্যবধান পূরণে শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে কর আদায় বাড়ানো কঠিন-সরকারের নতুন পরিকল্পনাই তা স্পষ্ট করছে।

এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, লক্ষ্য পূরণ করা অবাস্তব নয়, অসম্ভবও নয়। এনবিআরের কর্মকর্তারা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেই তা সম্ভব।

তিনি বলেন, নিরীহ করদাতাদের পেছনে নিরীক্ষার নামে সময় নষ্ট না করে যারা এখনো করের আওতায় আসেনি, তাদের আনার চেষ্টা করতে হবে। বড় বড় করদাতার দিকেও নজর দিতে হবে। সম্পদশালী ও দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ফাইল ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। সাধারণ করদাতাদের নিরীক্ষায় ফেলে হয়রানি না করে যারা কর ফাঁকি দেন, তাঁদের পেছনে সময় দিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, করের আওতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন করদাতাদের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

আসল ‘জাদুর চাবিকাঠি’ তথ্যের সমন্বয়: এনবিআরের নতুন পরিকল্পনাগুলো আলাদাভাবে দেখলে এগুলো অনেকগুলো প্রযুক্তিগত উদ্যোগ বলে মনে হতে পারে-তথ্যভান্ডার, স্বয়ংক্রিয় প্রোফাইল তৈরি, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা, মুখোমুখি যোগাযোগ ছাড়া কর নির্ধারণ, বাজার অংশ যাচাই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষা। কিন্তু এসব উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দু একটিই-তথ্যের সমন্বয় এবং সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্য ব্যবহার।

করদাতা যে তথ্য নিজে ঘোষণা করেন, তার বাইরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে তাঁর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নানা তথ্য ছড়িয়ে রয়েছে। ব্যাংকের কাছে লেনদেনের তথ্য, ভূমি অফিসের কাছে জমির তথ্য, বিআরটিএর কাছে গাড়ির তথ্য, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তথ্য, কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য, কাস্টমসের কাছে আমদানি-রপ্তানির তথ্য, মূল্য সংযোজন করের কাছে বিক্রয়ের তথ্য এবং বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যয়ের তথ্য রয়েছে।

এতদিন এসব তথ্য বিচ্ছিন্নভাবে থাকায় করদাতার সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক চিত্র এক জায়গায় পাওয়া কঠিন ছিল। নতুন পরিকল্পনা সফল হলে এনবিআর মূলত এসব বিচ্ছিন্ন তথ্য একটি করদাতা প্রোফাইলে এনে প্রশ্ন করবে-ঘোষিত আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে মিল আছে কি না।

ব্যক্তির ক্ষেত্রে উত্তর না মিললে উচ্চঝুঁকির সংকেত আসবে। কোম্পানির ক্ষেত্রে কাঁচামাল, উৎপাদন, বাজার অংশ, বিক্রয় ও রাজস্বের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য ধরা পড়বে। সেখানেই নতুন কৌশলের সম্ভাব্য শক্তি।

তবে প্রযুক্তি একা কোনো জাদুর কাঠি নয়। ভুল তথ্যের ওপর তৈরি তথ্যব্যবস্থা ভুল ফল দেবে, দুর্বল সাইবার নিরাপত্তা করদাতার তথ্য ঝুঁকিতে ফেলবে। আবার কর্মকর্তার ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকলে ডিজিটাল ব্যবস্থাও হয়রানির নতুন মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

ফলে এনবিআরের সামনে এখন আসল পরীক্ষা পরিকল্পনা ঘোষণার নয়, বাস্তবায়নের। তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন যদি সত্যিকার অর্থে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভরভাবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে কর আদায়ে এনবিআরের নতুন কৌশলের সবচেয়ে বড় ‘জাদুর চাবিকাঠি’ হবে তথ্যের সমন্বয়। আর সেই তথ্যের সঙ্গে করদাতার ঘোষণার গরমিল ধরতে পারলেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনের চিরচেনা চিত্র।
সানা/আপ্র/২৬/৮/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

নতুন আমদানি নীতি চালু করলো সরকার
২৫ আগস্ট ২০২৬

নতুন আমদানি নীতি চালু করলো সরকার

ঋণপত্র বা এলসির পাশাপাশি এখন থেকে মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে পারবে...

গরমে বাড়ছে ডাবের চাহিদা, একটির দাম ২২০ টাকা
২৫ আগস্ট ২০২৬

গরমে বাড়ছে ডাবের চাহিদা, একটির দাম ২২০ টাকা

ভাদ্রের তীব্র গরমে শরীর জুড়াতে ডাবের পানির চাহিদা বেড়েছে। আর বাড়তি চাহিদা ও বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ব...

সরকারের ৬ মাস: ১২ সূচকে স্বস্তি, ১৯টিতে গভীর শঙ্কা
২৪ আগস্ট ২০২৬

সরকারের ৬ মাস: ১২ সূচকে স্বস্তি, ১৯টিতে গভীর শঙ্কা

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্রে বড় ধরনের বৈপরীত্য ফুটে...

১৪ দিনেই ব্যবসার লাইসেন্স, আসছে আরো সুবিধা
২৩ আগস্ট ২০২৬

১৪ দিনেই ব্যবসার লাইসেন্স, আসছে আরো সুবিধা

দেশে ব্যবসা শুরু ও বিনিয়োগের অনুমোদন বা লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে ১৪ দিনের মধ্যে ব্যবসায়ি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

চাঁদাবাজদের সঙ্গে পুলিশ জড়িত থাকলেও তালিকা হবে

সারাদেশে চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরির পাশাপাশি এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদেরও তালিকা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরসহ দেশের সব মহানগর এলাকায় চিহ্নিত চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তাঁদের ধরতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মন্ত্রী। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন মন্ত্রীর এই বক্তব্যে চাঁদাবাজিসহ অপরাধ কমবে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে