মনিরুজ্জামান অন্তর
বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘর অন্ধকার হয়- এমন কথা নতুন নয়, অধিক পুরোনো। যখন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত দীর্ঘ লোডশেডিং চলতে থাকে, তখন অন্ধকার শুধু ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এই অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে। সাম্প্রতিক কালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে, তা নিছক সাময়িক বিদ্যুৎ-বিভ্রাট হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার গভীর দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা এ দেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর এত বছর পরেও কেন মানুষকে আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে বসে থাকতে হবে? কেন একজন কৃষক সেচের পাম্প চালাতে পারবেন না? কেন একজন শিক্ষার্থী তার পড়ার টেবিলে আলো পাবে না? কেন একজন শ্রমিকের কর্মঘণ্টা নষ্ট করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু ‘গ্যাসের সংকট’ বলে গোঁজামিল দিয়ে শেষ করে দেওয়া যায় না। বরং গ্যাস-সংকট কেন হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনায় তার প্রতিকার কতা ছিল, বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা কী, আর সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি কতটুকু- এসব প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সেই কেন্দ্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা, তেল, সঞ্চালন লাইন ও বিতরণব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হয়। এখানেই আমাদের পরিকল্পনার বড় অসঙ্গতি। ডেইলি সানের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন মতে, গ্যাসের অভাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয়নি। এমনকি প্রায় ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক সক্ষমতার বিপরীতে সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ব্যবহারের সক্ষমতার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত সক্ষমতা পড়ে আছে অথচ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে সেই কেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। আবার বিদ্যুৎ না থাকায় শিল্পের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এর খরচ কে দিচ্ছে? আমি, তুমি, সে, আপনি- মোদ্দা কথা জনগণ।
সাম্প্রতিক কালে দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিদ্যুতের সংকট হলে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষকেই কেন বেশি অন্ধকারে থাকতে হবে? গ্রামের কৃষকরা বিদ্যুৎ না পেলে সেচ দিতে পারছেন না, শিক্ষার্থীরা পড়তে পারে না, গরমে শিশু ও বয়স্ক মানুষের কষ্ট বাড়ছে। শহরের অপেক্ষাকৃত সচ্ছল নাগরিক বিকল্প ব্যবস্থায় কিছুটা হলেও সংকট সামাল দিতে পারেন। এ বৈষম্য শুধু বিদ্যুৎ বণ্টনের সমস্যা নয়, সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও বটে।
লোডশেডিংয়ে গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার শিল্পাঞ্চলগুলোতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একটি কারখানার মেশিন বন্ধ হওয়া মানে শুধু কয়েক ঘণ্টার উৎপাদন বন্ধ হওয়া নয়। এতে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে। বাংলাদেশ যখন রপ্তানি আয় বাড়ানোর কথা বলছে, তখন জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদনই যদি ব্যাহত হয়, সেটি নিঃসন্দেহে বড় উদ্বেগের বিষয়।
ভুল পরিকল্পনার দায় জনগণ কেন নেবে? সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি এখানেই। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলো। কিন্তু দেখা গেল সেটি চালানোর মতো জ্বালানি নেই। কোথাও গ্যাস আছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই। কোথাও বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে কিন্তু সঞ্চালনব্যবস্থা দুর্বল। কোথাও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব কিন্তু বিতরণব্যবস্থায় সমস্যা। এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করে বিদ্যুৎনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ সবকিছুকে একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। আর সেই পরিকল্পনার হিসাব জনগণের সামনে থাকতে হবে। কয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কতটি চলছে, কতটি বন্ধ, কেন বন্ধ, কোন কেন্দ্র কত দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, কোন কেন্দ্রকে কত অর্থ দেওয়া হচ্ছে- এসব তথ্য আরো স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান সংকট থেকে সরকারের প্রথম শিক্ষা হওয়া উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যান দিয়ে বিদ্যুৎনিরাপত্তা বিচার করা যায় না। মানুষ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা চায় না। জনগণ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ চায়। শিল্পোদ্যোক্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা জানতে চায় না। তিনি চান তার কারখানা কখনো বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ হবে না, সেটি নিশ্চিত করতে। কৃষক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেগাওয়াট জানতে চান না। তিনি চান সেচের সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পাওয়ার নিশ্চয়তা। শিক্ষার্থী বিদ্যুৎ খাতের সাফল্যের প্রচার শুনতে চায় না। সে চায় রাতে পড়ার টেবিলে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলুক। এই সহজ সত্যটি নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে।
বর্তমান লোডশেডিং শুধু বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নয়; অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও জনজীবনের সমস্যা। এ সংকটের সমাধান প্রয়োজন। বিদ্যুৎ খাতে খণ্ডিত সিদ্ধান্ত, সাময়িক ব্যবস্থা ও সংকট দেখা দিলে তৎপর হওয়ার সংস্কৃতি চলতে পারে না। প্রয়োজন পূর্বপরিকল্পনা, জ্বালানিনিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, আধুনিক গ্রিড এবং সর্বোপরি জবাবদিহি। মানুষের ঘরে অন্ধকার নামতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের পরিকল্পনায় যেন অন্ধকার না থাকে।
আজকের লোডশেডিংকে যদি শুধু একটি সাময়িক দুর্ভোগ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরো বড় সংকটের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আর যদি এটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে এখান থেকেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কারের শুরু হতে পারে। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে তার ওপর নির্ভর করে না। উন্নয়নের প্রকৃত পরীক্ষা হলো সেই বিদ্যুৎ কতা নির্ভরযোগ্যভাবে মানুষের ঘরে পৌঁছায়। দেশের মানুষ আর প্রতিশ্রুতির কথা শুনতে চায় না। জনগণ চায় ঘরে বিদ্যুৎ, কৃষিতে বিদ্যুৎ, শিল্পে বিদ্যুৎ, শিক্ষায় বিদ্যুৎ; জনতা চায় নিরবচ্ছিন্ন ও ন্যায্য বিদ্যুৎ সরবরাহ। এই দাবি কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের নাগরিকের ন্যায্য অধিকার।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/২৯.০৮.২০২৬