মরিচ মানেই ঝাল-জিহ্বায় আগুন ধরানো এক ছোট্ট সবুজ বা লাল ফল। কিন্তু সেই চেনা মরিচই যে দৈর্ঘ্যে টেনিস র্যাকেটের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সুইজারল্যান্ডের শখের বাগানি জুর্গ ভিসলি সেই অসম্ভবকেই যেন সম্ভব করে দেখিয়েছেন। তাঁর ফলানো একটি মরিচের দৈর্ঘ্য এখন ৫২ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার-যা গড়পড়তা একটি মরিচের তুলনায় রীতিমতো বিস্ময়কর।
এ মরিচ শুধু বড়ই নয়, এটি একটি বিশ্বরেকর্ডের নাম। নিজের গড়া রেকর্ড নিজেই ভেঙে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা মরিচ ফলানোর কৃতিত্ব আবারও অর্জন করেছেন জুর্গ।
গত ১১ আগস্ট সুইজারল্যান্ডের থুরগাউয়ের ডোজভিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মরিচটির দৈর্ঘ্য মাপা হয়। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, এর দৈর্ঘ্য ৫২ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার বা ১ ফুট ৮ দশমিক ৬ ইঞ্চি। অর্থাৎ, একটি রান্নাঘরের বেলনের চেয়েও লম্বা এই মরিচ দেখতে প্রায় শিশুদের টেনিস র্যাকেটের সমান।
মজার বিষয় হলো, সবচেয়ে লম্বা মরিচের বিশ্বরেকর্ড গত প্রায় এক দশকে মাত্র তিনবার বদলেছে। আর তিনবারই সেই রেকর্ডের পেছনে ছিলেন একই মানুষ-জুর্গ ভিসলি।
২০১৭ সালের অক্টোবরে প্রথমবার বিশ্বরেকর্ড গড়েন তিনি। তাঁর ফলানো মরিচটির দৈর্ঘ্য ছিল ৪৫ সেন্টিমিটার। এক বছর পর, ২০১৮ সালে, ৫০ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার লম্বা মরিচ ফলিয়ে নিজের রেকর্ড নিজেই ছাড়িয়ে যান। এরপর সেই রেকর্ড টিকে ছিল দীর্ঘ আট বছর। অবশেষে এবার ৫২ দশমিক ৫ সেন্টিমিটারের মরিচ নিয়ে আবারও নিজের রেকর্ড ভাঙলেন তিনি।
এই সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি, যত্ন আর অভিজ্ঞতার সমন্বয়। জুর্গ জানান, গত মার্চে ঘরের ভেতর ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বিশেষ কৃত্রিম আলোর নিচে তিনি মরিচের বীজ বপন করেন। এপ্রিলের শেষ দিকে তুষারপাতের আশঙ্কা কেটে গেলে চারাগুলো বাগানে রোপণ করেন। মাটিতে মেশান প্রচুর পরিমাণে ভালোভাবে পচানো জৈব সার। এরপর নিয়মিত পানি ও পরিমিত সার দিয়ে গাছের পরিচর্যা করেন।
তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে, বড় মরিচ ফলাতে শুধু বেশি সার দিলেই হয় না। বরং অতিরিক্ত সার দিলে গাছে মরিচের চেয়ে পাতাই বেশি জন্মায়। তাই প্রয়োজন পরিমিতি, ধৈর্য আর সঠিক পরিচর্যা।
জুর্গের সব রেকর্ড করা মরিচ এসেছে ‘জো’স লং’ নামের এক ধরনের ক্যায়েন মরিচ থেকে। গত এক দশকে প্রতিটি মৌসুমের সবচেয়ে ভালো মরিচ থেকে বীজ সংরক্ষণ করে ধীরে ধীরে নিজের একটি জাতও তৈরি করেছেন তিনি। নাম দিয়েছেন ‘ভিসলি বিগ লং’।
তবে ৫২ দশমিক ৫ সেন্টিমিটারেই থামতে চান না জুর্গ। তাঁর বিশ্বাস, এর চেয়েও লম্বা মরিচ ফলানো সম্ভব। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা মরিচের আকৃতি। যত লম্বা হয়, ততই সেটি বাঁকা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। আবার জোর করে সোজা করতে গেলে ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে লম্বা মরিচ ফলানোর পাশাপাশি সেটিকে অক্ষত ও সোজা রাখাও এক বড় পরীক্ষা।
বিশ্বরেকর্ডের এই মরিচ অবশ্য শুধু তাকিয়ে দেখার জন্য নয়, রান্নাঘরেও তার জায়গা আছে। জুর্গ কাঠের চুলায় মরিচ শুকিয়ে গুঁড়া করেন। তাঁর প্রিয় খাবারের একটি র্যাটাটুই; এর সঙ্গে তিনি ভাজা কিমা ও সামান্য গলানো কুচি করা পনির পরিবেশন করেন।
মরিচের বাইরেও জুর্গের বাগানজুড়ে রয়েছে সাফল্যের গল্প। শসা, গাজর, বিট, লাল বাঁধাকপি, ট্রম্বোলিনো স্কোয়াশ, লম্বা লাউ ও বিশাল কুমড়াসহ নানা ধরনের সবজি ফলিয়ে নিজ দেশেও একাধিক রেকর্ড গড়েছেন তিনি। একসময় তাঁর নামে ছিল ২০টির বেশি সুইস রেকর্ড।
একটি ছোট্ট বীজ থেকে জন্ম নেওয়া সেই মরিচ তাই শেষ পর্যন্ত শুধু বাগানের ফল হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে ধৈর্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর দীর্ঘদিনের সাধনার এক অনন্য স্বাক্ষর। ঝালের জন্য পরিচিত মরিচ এবার বিশ্বকে তাক লাগিয়েছে তার দৈর্ঘ্য দিয়ে-আর সেই দীর্ঘ মরিচের গল্পে বারবার ফিরে এসেছে একই নাম, জুর্গ ভিসলি। তথ্যসূত্র: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস
সানা/ডিসি/আপ্র/২৯/৮/২০২৬