রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্ত ও গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা বিবেচনায় মামলায় গ্রেফতার আসামিদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে নগরের জাহাজ কোম্পানি এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে নাগরিক কমিটি। এতে সংগঠনের সদস্যসচিব আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ লিখিত বক্তব্যে পুলিশের তদন্ত ও হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিক নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন তুলে ধরেন।
নাগরিক কমিটির অভিযোগ, দুই আসামিকে গ্রেফতারের পর পুলিশ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গণমাধ্যমে যে বক্তব্য দিয়েছে, তার সঙ্গে নিহতদের স্বজনদের বক্তব্য, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা এবং পুলিশ ও ফরেনসিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে কিছু অসংগতি রয়েছে। ফলে এ ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন, সংশয় ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি সংগঠনটির।
সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন তোলা হয়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে একটি পরিবারের চারজনকে হত্যা করার বিষয়টি কতটা স্বাভাবিক। চারজনকে হত্যার পর আসামিরা দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করে গোসল ও খাবার খেয়েছে-পুলিশের এমন বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে জানানো হয়।
ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, বাড়ির বিদ্যুৎ-সংযোগের তার কে বা কারা কেটেছে, হত্যার আগে ও পরে অচেনা মোটরসাইকেলে কারা যাতায়াত করেছিল এবং কেউ বাড়িটি নজরদারিতে রেখেছিল কি না-এসব বিষয় যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়েছে কি না, তা জানতে চেয়েছে নাগরিক কমিটি।
এ ছাড়া লুট হওয়া টাকা ও স্বর্ণালংকারের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। পুলিশের বক্তব্যে লুট হওয়া অর্থের পরিমাণ এবং আসামিদের ভাগে পাওয়া অর্থের হিসাবে অসংগতি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে ইয়াবার সংখ্যার হিসাব কেন পরিবর্তিত হয়েছে, তারও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের আগে নিহত পরিবারের সদস্যদের কোনো আশঙ্কা বা অভিযোগ ছিল কি না, বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে তাঁদের কাউকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না এবং এসব বিষয় তদন্তে যাচাই করা হয়েছে কি না-এসব প্রশ্নও উত্থাপন করা হয়।
নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ বলেন, শুধু আসামিদের স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর করে তদন্ত শেষ করা উচিত নয়। সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত, মুঠোফোনের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যসহ সব তথ্যের সঙ্গে পুলিশের বর্ণনা মিলিয়ে দেখতে হবে। তদন্তে যেসব অসংগতি রয়েছে, সেগুলো দূর করে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে।
তিনি বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলছে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চায়। গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকে হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে গণপতি চক্রবর্তীসহ চার হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত, প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।
আসামিদের পক্ষে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত আইনজীবীদের: এদিকে চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামির পক্ষে আপাতত আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি। ভবিষ্যতে এ ঘটনায় অন্য কেউ গ্রেফতার হলেও তাঁর পক্ষে আইনজীবী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে তদন্তের গতিপথ বা ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় পরিবর্তন এলে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রংপুর আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব ও সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন। এ সময় রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী উপস্থিত ছিলেন।
আফতাব উদ্দিন বলেন, চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাঁদের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়টি প্রতীয়মান হওয়ায় এবং হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আইনজীবীরা অর্থের বিনিময়ে অন্যায়কে সমর্থন করেন-এমন ধারণা সঠিক নয়। চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামিদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত তারই একটি উদাহরণ। নিহতদের স্বজনেরা যাতে সঠিক বিচার পান, সেটিই তাঁরা চান।
যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড: গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ/প্রীয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি অবসর নেন। নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের পর প্রায় তিন বছর ধরে সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন তিনি। অবসরের পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবেও রোগী দেখতেন।
এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।
পরে একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামের দুই তরুণকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার দুজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তবে নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু আসামিদের স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য পারিপার্শ্বিক ও বৈজ্ঞানিক আলামত যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমেই চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব।
সানা/আপ্র/২৯/৮/২০২৬