চরম তাপপ্রবাহের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপজনিত চাপকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, কুলিং সেন্টার স্থাপন, নগর সবুজায়ন এবং কর্মস্থলে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। শনিবার (২৯ আগস্ট) আবহাওয়া অধিদপ্তর ও জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষজ্ঞ পরামর্শ সভায় এসব দাবি ও সুপারিশ উঠে আসে। সভা শেষে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সভায় চরম তাপের অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরে জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ সেন্টারের ট্রাস্টি এস এম মোর্শেদ বলেন, তাপজনিত কারণে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১ দশমিক ৮ থেকে ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতির পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪ শতাংশের সমান। তিনি বলেন, এ ক্ষতির প্রভাব ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। চরম তাপের কারণে রাজধানীতে বছরে প্রায় ৩ শতাংশ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যা ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির উৎপাদনশীলতা হারানোর সমান।
তাপজনিত চাপ যথাযথভাবে মোকাবিলা করা না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হারাতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এস এম মোর্শেদ।
বাড়ছে স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি: সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক। তিনি জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৩৫ দিন দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ছিল।
দ্রুত নগরায়ণ, খোলা জায়গায় কর্মরত শ্রমিকদের সংখ্যা এবং শীতল পরিবেশে প্রবেশের সীমিত সুযোগ তাপজনিত ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, কৃষিশ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক ও হকাররা তাপপ্রবাহের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন।
অতিরিক্ত তাপের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পেশাগত রোগের বিষয়টি উল্লেখ করে মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা আরো কার্যকর করা, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, কুলিং সেন্টার স্থাপন, নগর সবুজায়ন এবং ‘কুল রুফ’ বা ছাদ শীতল রাখার ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন।
খাতভিত্তিক পরিকল্পনার তাগিদ: সভাপতির বক্তব্যে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মোমিনুল ইসলাম বলেন, চরম তাপের প্রভাব মোকাবিলায় খাতভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনা জরুরি। কৃষি, পরিবহন, নির্মাণ ও পোশাক খাতে তাপজনিত ঝুঁকি আলাদাভাবে চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
সভায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকি চিহ্নিত করতে ঝুঁকি মানচিত্র প্রণয়ন, আবাসিক ভবনে তাপ কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুর্যোগের স্থায়ী আদেশাবলিতে ‘হিট স্ট্রেস’ অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া তাপজনিত অসুস্থতাকে পেশাগত রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং কর্মস্থলে পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির পয়েন্ট স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে চরম তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বিষয়টিকে শুধু আবহাওয়াজনিত সমস্যা হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য, শ্রম, নগর ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে তাপজনিত ক্ষতি কমানোর অন্যতম প্রধান উপায়।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/২৯/৮/২০২৬