ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে তা সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিমালা ও আচরণবিধির আওতায়। তবে কোনো শিক্ষার্থীকে জোর করে রাজনৈতিক দলের স্বার্থে মিছিল-মিটিংয়ে নেওয়া যাবে না।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির আয়োজিত ‘ফ্রেশার রিসেপশন অ্যান্ড ক্যারিয়ার গাইডলাইন’ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন নূরুল ইসলাম সাদ্দাম।
ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গে এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দলীয় রাজনীতি বাদ দিলে তো এই প্রোগ্রামটা আপনাদের জন্য কেউ করতে পারত না। এগুলো বাদ দেওয়া ঠিক না।’
ছাত্ররাজনীতির সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে তিনি বলেন, ‘মাথাব্যথা হয়েছে, মাথা কেটে দিলে তো আপনার অস্তিত্বই থাকবে না। তো মাথাটা রেখে কীভাবে এটাকে সংস্কার করা যায়, সেই চিন্তাটা করা উচিত।’
ছাত্ররাজনীতির ধরন নিয়ে শিবির সভাপতি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নিজস্ব আচরণবিধি থাকা উচিত। তাঁর ভাষায়, ‘ইউনিভার্সিটিতে একটা কোড অব কন্ডাক্ট থাকা উচিত। ইউনিভার্সিটির নিজস্ব পলিসির আন্ডারে ইউনিভার্সিটিতে পলিটিক্স চলা উচিত।’
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ছাত্রশিবির প্রস্তাব দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হবে মূল্যবোধের অভিন্ন ক্ষেত্র। প্রতিটি রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন তাদের আদর্শ শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরবে। শিক্ষার্থীরা সেই আদর্শ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন।
তবে কোনো শিক্ষার্থীকে জোর করে কোনো রাজনৈতিক দল বা ‘মাদার পার্টির’ স্বার্থ বাস্তবায়নে মিছিল-মিটিংয়ে নেওয়ার বিরোধিতা করেন তিনি।
গণরুম-গেস্টরুমের বিরোধিতা
ক্যাম্পাসে ‘গণরুম’ ও ‘গেস্টরুম’ সংস্কৃতির কঠোর বিরোধিতা করে শিবির সভাপতি বলেন, ‘কখনোই গণরুম এবং গেস্টরুম চালু করা যাবে না। যারা চালু করবে, সম্মিলিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে হবে।’
এক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করেন, ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি থাকলে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিজ দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করবেন কি না। জবাবে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, যার যার আদর্শ বাস্তবায়ন করা স্বাভাবিক। তবে তা অবশ্যই ক্যাম্পাসের স্বার্থে হতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতার পোস্টার ক্যাম্পাসে সাঁটানো যাবে না। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ক্যাম্পাসে এলে তাঁর নামে স্লোগানও দেওয়া যাবে না।
ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে বিতর্ক
জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে শিবিরের অবস্থান প্রসঙ্গেও কথা ওঠে অনুষ্ঠানে। এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আব্দুল কাদের দাবি করেছিলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্রশিবির নেতা এস এম ফরহাদ আন্দোলনের নয় দফার একটি দাবিতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি যুক্ত করতে চেয়েছিলেন।
আব্দুল কাদেরের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি ফরহাদ সপ্তম দফায় ‘ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ’ করার দাবি যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা ও বিতর্ক হয়। পরে দাবিটি ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ’ করার ভাষায় চূড়ান্ত করা হয়।
আবাসন সংকট নিয়ে প্রশ্ন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিয়েও কথা বলেন নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারা হলে থাকেন, সে বিষয়ে হাত তুলতে বলেন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের সমাধান না হওয়ায় প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, মেধার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া একজন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হলে একটি আসন দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৬০ বছরেও কেন সক্ষম হলো না, তার জবাব থাকা উচিত।
নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ‘ফার্স্ট ইয়ারের একজন স্টুডেন্ট মায়ের পেট ছেড়ে এই ইউনিভার্সিটিতে মেধার ভিত্তিতে চান্স পাওয়ার পরে কেন তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হলে একটা সিট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৬০ বছরে দিতে পারবে না-এর জবাব কী আছে? এটা আমাদের এই শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য লজ্জা।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সুবিধা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারের দুর্বলতা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিবির সভাপতি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর দেশে আরো অন্তত ৪০ থেকে ৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে শিক্ষক নিয়োগ সম্ভব হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারের যে দুর্বলতা রয়েছে, তা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সানা/আপ্র/২৯/৮/২০২৬