২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত খালিদ শেখ মোহাম্মদের এফবিআই কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি আদালতে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেছেন মার্কিন সামরিক বিচারক। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে গুয়ান্তানামো বে-তে চার দিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদের সময় দেওয়া ওই বক্তব্য তিনি স্বেচ্ছায় দেননি বলে রায় দিয়েছেন বিচারক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাইকেল শ্রামা।
গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দেওয়া এই রায় দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা ৯/১১ মামলায় মার্কিন সরকারের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রসিকিউশন মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে খালিদের ওই বক্তব্যগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। বিচারকের রায়ের ফলে সেগুলো আসন্ন সামরিক বিচারে ব্যবহার করা যাবে না।
খালিদ শেখ মোহাম্মদকে ২০০৩ সালে পাকিস্তান থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাঁকে কয়েক বছর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা সিআইএর গোপন বন্দিশিবিরে রাখা হয়। সেখানে তাঁকে ওয়াটারবোর্ডিংসহ বিভিন্ন কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতির মুখোমুখি করা হয়, যেগুলো ব্যাপকভাবে নির্যাতন হিসেবে বিবেচিত। ২০০৬ সালে তাঁকে গুয়ান্তানামো বে-তে স্থানান্তর করা হয়।
বিচারক শ্রামা তাঁর রায়ে বলেন, সিআইএর হেফাজতে খালিদের ওপর চালানো নির্যাতন ও দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদের সময়ও তাঁর ওপর প্রভাব ফেলেছিল। বিচারকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খালিদের মধ্যে এমন ভয় তৈরি হয়েছিল যে জিজ্ঞাসাবাদকারীদের সহযোগিতা না করলে তাঁকে আবারো কঠোর নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এ ছাড়া এফবিআই কর্মকর্তারা তাঁকে নীরব থাকার অধিকার কিংবা আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার অধিকার সম্পর্কে যথাযথভাবে জানাননি বলেও বিচারক উল্লেখ করেন। ফলে প্রসিকিউশন খালিদের বক্তব্য স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছিল-এমন প্রমাণ দেখাতে পারেনি বলে আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
তবে এ রায়ের সঙ্গে দ্বিমত জানিয়েছেন খালিদকে জিজ্ঞাসাবাদকারী এফবিআইয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফ্রাঙ্ক পেলেগ্রিনো। তিনি বলেছেন, খালিদ স্বেচ্ছায় নিজের ভূমিকা স্বীকার করেছিলেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তাঁর বক্তব্য, খালিদকে তিনি কথা না বলার সুযোগ থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন।
মামলার প্রধান প্রসিকিউটর রিয়ার অ্যাডমিরাল অ্যারন সি. রুগ জানিয়েছেন, সরকার রায়টি পর্যালোচনা করছে এবং শিগগিরই এর বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। বিচারক প্রসিকিউশনকে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পাঁচ দিন সময় দিয়েছেন; প্রয়োজনে আরো পাঁচ দিন সময় চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে চলতি সপ্তাহেই খালিদ শেখ মোহাম্মদ ও তাঁর তিন সহযোগীর বিচার শুরুর নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিচারক শ্রামা আগামী ২০২৮ সালের ৫ জুন বিচার শুরুর দিন ঠিক করেছেন। দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও প্রমাণ গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের কারণে এর আগে একাধিকবার বিচার পিছিয়েছে।
খালিদের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র ও পেন্টাগনে উড়োজাহাজ ছিনতাই করে হামলার পরিকল্পনা তৈরির অভিযোগ রয়েছে। ২০০১ সালের ওই হামলায় নিউইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া ও পেন্টাগনে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন।
মামলায় খালিদসহ চার আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। ২০২৪ সালে খালিদ ও আরো দুই আসামি এমন একটি সমঝোতায় সম্মত হয়েছিলেন, যার মাধ্যমে তাঁরা মৃত্যুদণ্ড এড়াতে পারতেন। তবে পরে সেই সমঝোতা বাতিল হয়ে যায় এবং মামলাটি আবার পূর্ণাঙ্গ বিচারের দিকে এগোয়।
খালিদের এফবিআইয়ের কাছে দেওয়া বক্তব্য বাতিল হওয়ায় এখন প্রসিকিউশনকে ওই প্রমাণ ছাড়াই মামলাটি এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি অন্য আসামিদের স্বীকারোক্তি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও আদালতে আরো আইনি লড়াই হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: উইয়ন নিউজ; সিবিএস নিউজ; নিউইয়র্ক টাইমস; রয়টার্স
সানা/ডিসি/আপ্র/২৯/৮/২০২৬