একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম: দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে নির্মিতব্য এই টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও পরিচালন দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে বড় আকারের কনটেইনার জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে সময় ও ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
রোববার (৩০ আগস্ট) পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ করছে ডেনমার্কভিত্তিক মারস্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনালটি চালু হলে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হবে। পাশাপাশি বছরে প্রায় ৮ লাখ টিইইউ কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা যুক্ত হবে চট্টগ্রাম বন্দরে।
৪৯ একর জমিতে আধুনিক টার্মিনাল: কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে লালদিয়া চরে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে গুপ্তা বাঁকের পরবর্তী এলাকায় টার্মিনালটি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের মোট ভূমির পরিমাণ প্রায় ৪৯ দশমিক ১৫ একর। এর মধ্যে প্রায় ৩২ একরজুড়ে মূল টার্মিনাল, ৭ দশমিক ১৫ একরজুড়ে কনটেইনার ইয়ার্ড এবং প্রায় ১০ একর এলাকায় ট্রাক পার্কিং ও পণ্য প্রবেশ-নির্গমন সুবিধা থাকবে।
প্রস্তাবিত টার্মিনালে ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটি নির্মাণ করা হবে। নকশা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ পরিচালনার ব্যবস্থা থাকবে। কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য থাকবে সাতটি জাহাজ-থেকে-তীরে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর ক্রেন। ইয়ার্ডে থাকবে ৩২টি বিদ্যুৎচালিত রাবার-চাকা ক্রেন। বছরে প্রায় ৮ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা থাকবে টার্মিনালটির।
এক দশকের বেশি সময়ের পরিকল্পনা: লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা এক দশকেরও বেশি সময়ের পুরোনো। ২০১৩ সালে প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক ও বাস্তব নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে লালদিয়া চরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে আসার পর প্রকল্পটি নতুন গতি পায়।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
এরপর ডেনমার্কভিত্তিক মারস্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস ২০২৩ সালের ২১ মে লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রস্তাব দেয়। একই বছরের ২৯ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য নীতিগত অনুমোদন দেয়।
২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ-ডেনমার্ক প্রথম পিপিপি যৌথ প্ল্যাটফর্মের সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়। পরে এপিএম টার্মিনালস প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এপিএমটি বিভিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়। একই দিনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপিএমটি বিভির মধ্যে কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
২০২৬ সালের ১৬ মার্চ চুক্তিটি কার্যকর হয়। এরপর চুক্তিতে নির্ধারিত পূর্বশর্ত পূরণের পর ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এপিএম টার্মিনালসের কাছে প্রকল্পের সাইট হস্তান্তর করে।
কমবে আঞ্চলিক বন্দরের ওপর নির্ভরতা: চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বন্দরে প্রায় ২ হাজার ৭০০ টিইইউ পর্যন্ত ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এর চেয়ে বড় জাহাজে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, কলম্বোসহ আঞ্চলিক বন্দরে নিয়ে গিয়ে বড় জাহাজে স্থানান্তর করতে হয়। এতে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় যুক্ত হয়।
এপিএম টার্মিনালসের হিসাবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় ৭ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় এই অতিরিক্ত ধাপ কমানো সম্ভব হবে। এতে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য পাঠাতে সময় সাশ্রয় হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের মতো সময়নির্ভর রপ্তানি খাতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমদানি পণ্য দ্রুত খালাস ও সরবরাহের ক্ষেত্রেও সুবিধা তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনে আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে সময় ও ব্যয়-দুটিই সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।
৩৩ বছরের কনসেশন: পিপিপির আওতায় বাস্তবায়ন হওয়া প্রকল্পে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জমি ও বন্দরের মালিকানা ধরে রাখবে। অন্যদিকে এপিএম টার্মিনালস প্রকল্পটির নকশা প্রণয়ন, অর্থায়ন, নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে।
৩৩ বছরের কনসেশন চুক্তির মধ্যে প্রথম তিন বছর নির্মাণপর্ব এবং পরবর্তী ৩০ বছর পরিচালনার মেয়াদ। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময় শেষে টার্মিনালটি হস্তান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। এপিএম টার্মিনালস চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করলে পরিচালনার মেয়াদ আরো ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) ও বন্দর বিশেষজ্ঞ মো. জাফর আলম বলেন, সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো কোনো ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াই একটি বড় অবকাঠামো পাওয়া যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ আসছে এবং বন্দরের সক্ষমতা বাড়ছে। তবে প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ করাই একটি চ্যালেঞ্জ।
বিদ্যুৎচালিত প্রযুক্তিতে জোর: বন্দর কর্মকর্তারা জানান, লালদিয়া টার্মিনালের নকশায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কনটেইনার ওঠানো-নামানো এবং ইয়ার্ড পরিচালনায় বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থাও থাকবে।
ভবিষ্যতে বন্দরে অবস্থানরত জাহাজে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহের উপযোগী অবকাঠামো রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ইয়ার্ডের ক্রেনগুলো প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে কর্মীদের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি পরিচালন দক্ষতা বাড়বে। জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যেই এসব প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে।
বাড়বে কর্মসংস্থান, তবে চ্যালেঞ্জও আছে: প্রকল্পটির নির্মাণপর্বে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। টার্মিনাল চালুর পর সরাসরি কয়েকশ মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি পরিবহন, গুদামজাতকরণ, পণ্য খালাস, জাহাজসেবা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
নতুন প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনব্যবস্থা চালু হওয়ায় দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রপাতি পরিচালনা, তথ্যপ্রযুক্তি ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হবে। ফলে স্থানীয় কর্মীদের নতুন ধরনের দক্ষতা অর্জনের সুযোগও তৈরি হবে।
তবে ব্যবসায়ী ও বন্দরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনালের সুফল পুরোপুরি পেতে শুধু নির্মাণকাজ শেষ করাই যথেষ্ট নয়। বড় জাহাজ চলাচলের জন্য কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ও নেভিগেশন ব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি। একই সঙ্গে টার্মিনালের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং বন্দর থেকে দ্রুত পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
টার্মিনালে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়লেও বন্দর থেকে দ্রুত পণ্য বের করে নেওয়ার ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থায় নতুন করে যানজট ও পণ্যজট তৈরি হতে পারে। কাস্টমস, পণ্য খালাস ও পরিবহন ব্যবস্থার গতি বাড়ানোও প্রকল্পটির সুফল নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলোর সরাসরি সেবা নিশ্চিত করাও বড় বিষয়। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক বন্দরসেবা ও নির্ভরযোগ্য নেভিগেশন নিশ্চিত করা গেলে বড় জাহাজের নিয়মিত সরাসরি আগমন বাড়বে। তখন লালদিয়া টার্মিনাল শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াবে না, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/২৯/৮/২০২৬