আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
অসুস্থ হলে আমরা চিকিৎসকের কাছে যাই। তিনি কোন ওষুধ লিখছেন, কী পরীক্ষা দিতে বলছেন কিংবা অস্ত্রোপচার দরকার বলছেন কি না- বেশির ভাগ সময়ই তা নিয়ে প্রশ্ন করার মতো জ্ঞান বা সাহস আমাদের থাকে না। আমরা বিশ্বাস করি, চিকিৎসক যা বলছেন, নিশ্চয়ই সেটিই আমাদের জন্য ভালো। কারণ অসুস্থ মানুষ তখন শুধু চিকিৎসা চান না, তিনি দ্রুত সুস্থ হওয়ার একটা আশাও চিকিৎসকের হাতে তুলে দেন। এ জায়গাতেই চিকিৎসা পেশার সবচেয়ে বড় শক্তি-আস্থা। কিন্তু সেই আস্থার সঙ্গে যখন অর্থের হিসাব জড়িয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন সামনে আসে।
যে পরীক্ষাটি আমাকে করতে বলা হলো, সেটি কি সত্যিই প্রয়োজন? যে ওষুধটি দেওয়া হলো, সেটিই কি আমার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত? যে অস্ত্রোপচারের কথা বলা হচ্ছে, সেটি কি না করেও চলতো? নাকি এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কখনো কখনো অন্য কোনো আর্থিক স্বার্থও কাজ করছে? প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কারণ আমরা চিকিৎসকদের বিশ্বাস করতে চাই। আমাদের পরিবারে, আমাদের সমাজে চিকিৎসকের প্রতি সেই বিশ্বাসের জায়গাটি খুব গভীর। তাই কোনো চিকিৎসক বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমরা একদিকে যেমন উদ্বিগ্ন হই, অন্যদিকে পুরো চিকিৎসক সমাজকে সন্দেহ করতেও চাই না। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ যখন বারবার সামনে আসে, তখন বিষয়টি নিয়ে একটু গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে এমন অভিযোগ নতুন নয়। চিকিৎসকের অতিরিক্ত ফি, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরীক্ষা- নিরীক্ষা, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠিয়ে কমিশন নেওয়া, ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা গ্রহণ, বেসরকারি হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ- এসব অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। হৃদরোগের চিকিৎসায় স্টেন্ট বা রিং ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আর্থিক স্বার্থের অভিযোগ শোনা যায়। এসব অভিযোগের প্রতিটি যে সত্য, তা অবশ্যই বলা যাবে না।
চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ নিষ্ঠা ও পেশাগত নৈতিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ যখন বারবার সামনে আসে, তখন সেগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াও কঠিন। তখন প্রশ্নটি শুধু ‘কোন চিকিৎসক ভুল করছেন’- এখানে থেমে থাকে না; বরং আরো বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়- আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কোথাও কি এমন কিছু তৈরি হয়েছে, যেখানে রোগীর প্রয়োজনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থও চিকিৎসার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ পাচ্ছে?
একজন চিকিৎসক যদি কোনো নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠানোর বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা পান, তাহলে সেই পরীক্ষা প্রয়োজনীয় হলেও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠবে। একই কথা প্রযোজ্য ওষুধের ক্ষেত্রেও। কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ লিখে চিকিৎসক যদি আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা পান, তাহলে রোগীর জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী ওষুধটি বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি কতটা স্বাধীন থাকছে- এটি জানার অধিকার রোগীর রয়েছে।
বিষয়টি শুধু একজন রোগীর অতিরিক্ত টাকা খরচ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কমিশন যদি কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা হাসপাতালের ব্যবসায়িক ব্যয়ের অংশ হয়ে যায়, সেই খরচ শেষ পর্যন্ত রোগীর কাছ থেকেই আদায় করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরীক্ষা, ওষুধ বা চিকিৎসাও একইভাবে রোগীর ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে। আবার কোনো রোগীর ক্ষেত্রে স্টেন্ট, অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনো ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রয়োজন কি না- এটি যদি চিকিৎসা বিজ্ঞানের বদলে আর্থিক স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে প্রশ্নটি আরো গুরুতর হয়ে ওঠে। কারণ তখন বিষয়টি শুধু অর্থের নয়, রোগীর জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নও এসে যায়। তবে এসব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পুরো চিকিৎসক সমাজকে অভিযুক্ত করা হবে আরো বড় অন্যায়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা দরকার- যেখানে চিকিৎসকও রোগীর স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক প্রণোদনার চাপ থেকে মুক্ত থাকবেন।
ব্যক্তির নৈতিকতার পাশাপাশি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের কাঠামো, বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবসায়িক মডেল, ডায়াগনস্টিক ও ওষুধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং স্বার্থের সংঘাত মোকাবিলার নীতিমালা- সবকিছুকেই নতুন করে দেখতে হবে। তাহলে কি আমাদের চলমান ব্যবস্থার পরিবর্তনের সুযোগ নেই? অবশ্যই আছে। প্রয়োজন শুধু অভিযোগের তালিকা তৈরি করা নয়, প্রয়োজন স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়ে একটি বিস্তৃত ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনা শুরু করা।
স্বাস্থ্য খাতকে একটি সামগ্রিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যে আনতে হবে। চিকিৎসা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, ওষুধ, ডায়াগনস্টিক সেবা, চিকিৎসা-সামগ্রী এবং রোগীর অধিকার- সবকিছুকে একটি সমন্বিত ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি- দুই খাতেই স্বচ্ছতা, মাননিয়ন্ত্রণ, মূল্য নির্ধারণ, তথ্য প্রকাশ এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
সময় এসেছে ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০’ নিয়েও নতুন করে ভাবার। আইন ও পেশাগত আচরণবিধিতে চিকিৎসকদের নৈতিক আচরণ সম্পর্কে বিধান রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যবসায়িক চরিত্র বদলেছে, বেসরকারি চিকিৎসা খাত বিস্তৃত হয়েছে, ডায়াগনস্টিক ব্যবসা ও চিকিৎসা-সামগ্রীর বাজার বড় হয়েছে। ফলে স্বার্থের সংঘাত, কমিশনভিত্তিক রেফারেল, আর্থিক প্রণোদনা এবং রোগীর অধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলো আরো স্পষ্টভাবে মোকাবিলা করার জন্য আইন ও নীতিমালা যুগোপযোগী করা প্রয়োজন হতে পারে। এক্ষেত্রে শুধু আইন সংশোধন করলেই হবে না। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
রোগীর অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা জরুরি। একজন রোগী বা তার পরিবার যেন অভিযোগ করার পর আরো হয়রানি বা অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের পেশাগত সংগঠনগুলোরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও পরামর্শ করে চিকিৎসা পেশার নৈতিক মানদণ্ড আরো শক্তিশালী করতে পারে। কমিশন সংস্কৃতি, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা চিকিৎসা এবং রোগীর অসহায়ত্বকে আর্থিক সুবিধায় পরিণত করার প্রবণতার বিরুদ্ধে পেশাজীবীদের নিজেদের মধ্য থেকেই একটি স্পষ্ট নৈতিক অবস্থান তৈরি হওয়া প্রয়োজন।
কোনো পেশার নৈতিক সংস্কার সবচেয়ে টেকসই হতে পারে ওই পেশার ভেতর থেকেই। তাই চিকিৎসকদের প্রতি শুধু অভিযোগ না তুলে তাদের সঙ্গে নিয়েই একটি নৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে। চিকিৎসক সমাজ যদি সম্মিলিতভাবে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে- রোগীর প্রয়োজনের বাইরে কোনো আর্থিক স্বার্থ চিকিৎসা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে না, তাহলে এর সামাজিক প্রভাব অনেক গভীর হবে।
শেষ পর্যন্ত এটি শুধু চিকিৎসকদের নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, আমাদের সামগ্রিক সামাজিক নৈতিকতার প্রশ্ন। যে সমাজ অনৈতিকতাকে দীর্ঘদিন সহ্য করে, একসময় সেটিই স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। তখন কমিশন হয়ে ওঠে ‘স্বাভাবিক’, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা হয়ে ওঠে ‘সতর্কতা’, আর রোগীর অতিরিক্ত ব্যয় হয়ে ওঠে ‘চিকিৎসার স্বাভাবিক খরচ’। এ জায়গা থেকেই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে- আমরা সত্যিই এই অনৈতিক সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেবো, নাকি সম্মিলিতভাবে এখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবো? রাষ্ট্র সংস্কার করবে, আইন আরো কার্যকর হবে, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান জবাবদিহির মধ্যে আসবে। কিন্তু পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটি হতে পারে আমাদের সম্মিলিত নৈতিক অবস্থান। কারণ আইন অনৈতিকতার শাস্তি দিতে পারে। তবে একটি নৈতিক সংস্কৃতি অনৈতিকতার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকেই কমিয়ে দিতে পারে।
চিকিৎসা অবশ্যই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হতে পারে-চিকিৎসক তার শ্রমের ন্যায্যমূল্য পাবেন, হাসপাতালও বৈধভাবে মুনাফা করতে পারে। কিন্তু ওই মুনাফা যেন কখনো রোগীর প্রয়োজনকে ছাপিয়ে না যায়- এটিই হওয়া উচিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার নৈতিক সীমারেখা। আমাদের কারো লক্ষ্য চিকিৎসাকে সন্দেহের জায়গায় নিয়ে যাওয়া নয়, আবার অন্ধ আস্থার জায়গাতেও রাখা নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত- চিকিৎসাকে স্বচ্ছতা, নৈতিকতা, জবাবদিহি ও পারস্পরিক আস্থার জায়গায় নিয়ে যাওয়া।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী
কেএমএএ/আপ্র/২৯.০৮.২০২৬